সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০, ১০:১১ অপরাহ্ন

বাবা তুমি শোনো

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান
  • প্রকাশের সময়ঃ সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২০
  • ৩৭৫ জন দেখেছেন
ছবি : অনলাইন

খুব ছোট্ট একটি মেয়ে আমি। তবুও অনেক কিছু ভাবতে হয়। চারপাশে ঘটে যাওয়া নিত্যনতুন কাহিনি আর সমাজের অসংগতির চিত্র দেখে মনটা কেঁদে উঠে। কখনো প্রতিবাদ করতে চাই। কিন্তু পারি না। কেউ বুঝতেও চায় না আমায়। আমি কী চাই, কী চায় আমার মন। ছোট্ট হলেও আমারও যে কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে, সে কথা ভাবে না কেউ। ভাবে না, আমার কাছের মানুষগুলো। বাবাকে অনেক কথাই বলতে চেয়েছি, কিন্তু ছোট বলে আমার যেন কোনো কথাই থাকতে পারে না, তাই বাবা কখনো বুঝতে চায়নি আমায়। এসব নিয়ে নিজের ভিতর খুব দুঃখ হয়। কখনো কখনো লুকিয়ে কাঁদি। আড়াল করে রাখতে চাই নিজের দুঃখগুলোকে। কিন্তু হালকা হয় না মনটা।

আমাকে বাবার এড়িয়ে চলার একটা কারণও আছে। আমার এক ভাই শুভ্র আর আমি। পিতামাতা সহ মোট চারজন নিয়ে আমাদের সংসার। ছেলে বলে বাবার কাছে ওর একটু আলাদা কদর। ছোট হলেও সে কথা আমি বুঝি। তাই এ নিয়ে কখনো ঈর্ষা করিনি। ও তো আমার-ই ভাই। হয়তো বাবা ওকে একটু বেশি ভালোবাসে, কিন্তু মাতো আমাকে অনেক পছন্দ করে। বাবা ওকে একটা পোশাক কিনে দিলে, মা আমায় কিনে দেয় দুটো। এ নিয়ে না-আছে ভাইয়ের কোনো অভিযোগ, না আমার। কষ্টটা অন্য জায়গায়। শুভ্র আমার থেকে মাত্র দু-বছরের বড়। আমার বয়স এখন বারো। ওর বয়স চৌদ্দ। শুভ্রের জন্মের পর বাবা কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করল। বাবাকে নিয়ে আমরা ভালোই ছিলাম।

বাবা একটি ছোট চাকরি করতেন। চাকরিটাও ছিল সরকারি। পেশার ব্যাপারে বাবা যেমন সচেতন ছিলেন তেমনি আমরাও বাবার পেশাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতাম। মাইনে যা ছিল তাতেই চলত আমাদের। মায়ের চাহিদা খুব একটা ছিল না। বাবার আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে মা-ও আমাদের চলতে অভ্যস্ত করে তুলতেন। তাই আমাদের চাহিদাও ছিল বাবার সামর্থের ভেতর। মহল্লায় সবাই আমাদের একনামে চিনত। অল্প আয়ে একটি সুখী পরিবার হিসেবে আমাদের জানত। বাবাকেও চিনত একজন সৎ মানুষ হিসেবে। তাই কম খেলেও স্বল্প আয়ে আমাদেরও একটা পরিতৃপ্তি ছিল। যা সম্পদ থাকলেও বেশির ভাগ মানুষ পায় না। কিন্তু আমরা তা পেতাম। মা আমাদের বলতেন, ‘হারামের দ্বারা যে শরীর লালিত হয় তার স্থান জাহান্নাম।’ আমরা মায়ের কথাকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম। তাই কোনো কিছু যখন আবদার করতাম, তার আগে ভাবতাম, এটা বাবা দিতে পারবে তো? কোনো কারণে বাবাকে যেন অহেতুক সমস্যায় পড়তে না-হয়।

কয়েক বছর হলো বাবা কেমন যেন বদলে গেছেন। মায়ের সাথেও ভালো ব্যবহার করেন না। প্রায়ই শুনি, বাবা আর মায়ের কলহ। প্রথম দিকে বুঝতে না-পারলেও একসময় বুঝতে পারলাম, বাবা আর আগের মতো নেই। আর এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত মায়ের সাথে ঝামেলা হচ্ছে। মায়ের কথা একটাই, হারামের দ্বারা অর্জিত কিছুই চাই না আমি। সে তোমার বাড়ি হোক আর গাড়ি। বাবাও দেখতেন, তার মতো একই পদে চাকরি করে অনেকে অনেক কিছু করছে, কিন্তু বাবা সেই একই জায়গায় পড়ে রয়েছেন। আমাদের চাহিদা তিনি পূরণ করছেন বটে, কিন্তু তাতে তার আত্মতৃপ্তি হয় না। বাবাও বুঝতেন, আমরা যা কিছু চাই, জেনেবুঝেই চাই। যেন বাবার উপর বোঝা হয়ে না-দাঁড়ায়।

একদিন আড়ালে থেকে কান পেতে বাবা-মায়ের কথা শুনলাম, বাবাকে মা বলছেন, ওগো, আমরা খুব একটা সুখ চাই না, চাই দু’মুঠো খেয়ে পরে বাঁচতে। তুমি এটুকু দাও, এ-ই যথেষ্ট, তাতেই আমরা খুশি। এমন কোনো কাজ কোরো না, যাতে এতদিনের অর্জিত পূণ্যকে হারিয়ে শুন্য হয়ে যেতে হয়। পাপের পথে পা বাড়িয়ো না।

এ কথা শোনার পর আমি বুঝতে পারলাম, আসলে বাবার কী হয়েছে। তাছাড়া অনেকদিন ধরে লক্ষ করছি, বাবার দ্রুত উন্নতি। না-চাইতেই অনেক কিছু পেয়ে যাই এখন। ঘুষের দিকে এভাবে বাবা হাত বাড়াবে ভাবতেও পারিনি। আজ বাবা অফিস যাবেন এমন সময় বাবাকে বললাম, বাবা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা বলার ছিল। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, মারে, আফিস থেকে ফিরে নাহয় তোর কথা শুনব। আমি বললাম, তাই হবে বাবা। আমি বুঝতে পারছি মা, তুই কী বলতে চাস। তুই ভরসা রাখ, তোর বাবার উপর। এই দুনিয়ায় তোরাই আমার কাছে দামি সম্পদ। বল, তোদের উপেক্ষা করে আমি কিছু ভাবতে পারি?

বাবার এইটুকু কথা শুনে আমি দারুণ খুশি হলাম। কারণ, বাবার কাছে আমার গুরুত্ব ফিরে এসেছে দেখে। সে শুনতে চায়, আমি কী বলতে চাই। তাই সারাটা দিন ধরে বাবার জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগলাম, বাবা কেন আসছে না। আজ যে সময় কিছুতেই ফুরাতে চায় না। আসার সময় হলেও বাবা আর আসছে না। আমি মাকে বললাম, মা, বাবাকে একটু ফোন কোরো না, বাবা যে আসছে না। মা বলল, একটু অপেক্ষা কর। আমার মনে হলো, মায়ের কণ্ঠটা কান্নায় জড়িয়ে আসছে। আমি অপলক মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা বলল, কী দেখছিস? আমি বললাম, কই নাতো।

ঘন ঘন হুঁইসেন বাজিয়ে গাড়ি আসছে। সম্ভবত এ্যাম্বুলেন্স। শব্দটা আমাদের কানে এলো। বাসার ভিতরে মা আর আমি। আমরা যেমন অবাক হলাম, চারদিক থেকেও লোকজন বেরিয়ে পড়ল। হৃদপি-টা বারবার ধরফড় করতে লাগল আমাদের, যখন দেখলাম, গাড়িটা ঠিক আমাদের বাসার দরজা সামনে গাড়িতে থাকা লোকগুলোর কারো মুখেই হাসি নেই, যেন রাতের অন্ধকার ওদের মুখগুলোকে ঢেকে দিয়েছে, তখন সমস্ত ভয় যেন ভর করল আমাদের উপর। আমার হাপিত্যেশও বেড়ে গেল। একবার ঘরের ভিতর পা রাখছি আরেকবার বেলকনীতে।

মা আমাকে বলল, দেখতো জাহিন কী হয়েছে? আমি নিচে গিয়ে দরজাটা খুলে আর সামনের দিকে এগোতে পারলাম না। বাবা বলে, আস্তে একটা চিৎকার করলাম। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ঘুমন্ত বাবার দিকে তাকিয়ে দুঃখ বিজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগলাম, বাবা, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল। সে কথা তো শুনলে না। শোনো বাবা, শোনো।

 

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪০,৪৩৫,৮৮০
সুস্থ
৩০,১৯৮,৯৪৬
মৃত্যু
১,১২০,২১৭

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233