মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৯:০০ পূর্বাহ্ন

শুভমের ইচ্ছে

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান
  • প্রকাশের সময়ঃ সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২০
  • ৪৩২ জন দেখেছেন
ছবি : অনলাইন

শুভম নামটা কার দেয়া সেকথা হয়তো তার নিজেরও জানা নেই। যেদিন থেকে সে নিজেকে আবিষ্কার করেছে সেদিন থেকেই তার পরিচয় সে একটি পথশিশু। শুভমের সাথে আমার প্রথম দেখা দোয়েল চত্ত্বরে। সকালবেলা মরনিং ওয়ার্ক শেষে বাংলা একাডেমি হয়ে শাহবাগের দিকে ফিরছিলাম, তখন ওর সাথে আমার দেখা। হাসি-খুশি চেহারা। মুখে উল্কি আঁকা। বাংলা বর্ণমালা অ আ আর শহিদ মিনারের ছবি দু’গালে। অপূর্ব সুন্দর এক বালক!

আমি বললাম, শুভম, ভাষা নিয়ে তোর কীসের এতো মাতামাতি? ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দাদাবাবু, এ কী কথা কইচেন আপনি! যে ভাষায় মনের কথা কইচি, তাদের জন্য এতটুকু সমবেদনা, শ্রদ্ধা থাকবে না, তাদের কথা এমনিতেই ভুলে যাব!

আমি চেয়ে দেখি শুভম কাঁদছে। আমি বললাম, তুই কাঁদছিস? ও দুই হাত দিয়ে চোখের পানি মুছলো। বাচ্চা ছেলে ঠিকঠাক পানিটুকুও মুছতে পারল না। আমি বললাম, তুই কাঁদছিলি কেন?

ও বলল, পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন একটি শিশু আমি। আমার আবার মায়ের ভাষা! মা কী জিনিস তা-ই বুঝলাম না। ওর কথায় আমার চোখেও জল এলো। ওকে আমি কাছে ডেকে নিয়ে দু-হাতে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম, ও কথা বলতে নেই বাবা।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুই কিছু খেয়েছিস? মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো, না। আমি পকেট থেকে দশটি টাকা বের করে দিয়ে বললাম, এ থেকে কিছু খেয়ে নিস বাবা। আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। তাই ইচ্ছে থাকলেও ওর সাথে আর সময় দিতে পারলাম না। মনে হলো, ও আমায় কিছু বলবে। আমি শুনতে পারলাম না ওর কথাা। আবারও পথ চলতে শুরু করলাম।

আমি সামনের দিকে এগুচ্ছি। কিন্তু মনটা পেছনে পড়ে আছে। কী যে একটা মায়ায় আবিষ্ট হয়েছি সে কথা বোঝাতে পারব না। তাই কিছুদূর গিয়েও বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি। যতবারই তাকিয়েছি ততবারবই দেখেছি শুভম আমার দিকে তাকানো।

ওর মায়া কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারলাম না। ইচ্ছে হলো ওর অব্যক্ত কথাটি শোনার জন্য। একটি অসহায় শিশু আমাকে কী বলতে চায়? একবার ভাবলাম, ফিরে কী লাভ। এভাবে শহরের অলিতে-গলিতে কত শুভমই পড়ে আছে। কে রাখে তাদের খোঁজ। বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের এই শহরে যখন বিবেকবান মানুষের বিবেক নড়ছে না, তখন আর আমার ওদের কথা ভেবে কী হবে। ওর মতো শত শুভমকে টেনে তোলার ক্ষমতা তো আমার নেই। আমি একজন মাস্টার মানুষ, বিনা টাকায় কাউকে বুদ্ধি দিতে পারি, চাইলে বিদ্যাও দিতে পারি। কিন্তু অর্থ দিয়ে কাউকে সাহায্য করার ক্ষমতা আমার নেই।

তবুও মনের টানে শুভমের কাছে চলে এলাম। ওকে ছেড়ে যেতে পারলাম না। শুভম আমায় দেখে বলল, দাদাবাবু, আবার ফিরলে কেন? আমি বললাম, তুই তো ফেরালি। আমায় কী বলতে চাস, শুভম? ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার কোনো কথাই যেন ও কর্ণপাত করছে না।

আমি আদর করে বললাম, বাবা, তুই কী বলতে চেয়েছিলি আমাকে। ছোট্ট ছেলে শুভম। বলতে কেমন জানি সংকোচবোধ করছে। আমি অভয় দিয়ে বললাম, বল না বাবা। আমি তোর কথা রাখতে চেষ্টা করব।

ও বলল, আমি ভিক্ষে চাই না, বাবু। আমি মানুষ হতে চাই। চাই একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। সমাজের অন্য সবার মতো আমিও ভালো করে বাঁচতে চাই। আমি শুভমের কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম! একটা সাত থেকে আট বছরের শিশু নিজের সম্পর্কে এতকিছু ভাবতে জানে?  আমি বললাম, শুভম, তুই আমার সাথে চল। তবে আমার বাসার কাজ লোক হয়ে নয়; আমার ছেলেদের মতো আরেকটা ছেলে হয়ে।

জানি, আমি তোর মতো হাজারো শুভমকে মানুষ করে তুলতে পারব না। একটা শুভমকে তো অমানুষ হবার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো।

 

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪৩,৭৭৬,৫৮৬
সুস্থ
৩২,১৭৯,৬৫২
মৃত্যু
১,১৬৪,৫১৫

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233