শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

লোকসংস্কৃতির সাধনা

নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়ঃ মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২০
  • ১০৯ জন দেখেছেন

মিহির মুসাকী

হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও সিনেমার কারণে বাউল গান, লোকগান বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাসন রাজা, বাউল শাহ আবদুল করিম, নেত্রকোণার উকিল মুন্সি জালালউদ্দিন খাঁর গান এখন সবার পরিচিত এবং প্রচুর মানুষের কাছে তা সমাদৃত। এক-দেড় দশক আগেও এটা কারো কল্পনার মধ্যে ছিল না। বাউল শিল্পীদের কদর এখন গ্রাম-গঞ্জ ছাড়িয়ে শহরের আধুনিক তরুণ-তরুণীদের কাছেও পৌঁছে গেছে। আমি ভেবে অবাক হই করপোরেট বিজ্ঞাপনে এখন লোকশিল্পী ও লোকগানের ব্যবহার হয়। কেন? কি শক্তি রয়েছে এর মধ্যে?

সহজ করে বলতে গেলে এ সকল গান, কবিতা জনমানুষের হৃদয়কে খুব সহজে স্পর্শ করে। এর সরলতাই এর সম্পদ। সুরের মধ্যে রয়েছে অকৃত্রিমতা, কথায় ও বাণীতে মর্মস্পর্শী আবেদন। এ কারণেই লোকগান এদেশে এত জনপ্রিয়। এখন শুধু প্রত্যন্ত গ্রামেই নয়, শহরের মানুষও রাত্রি জেগে এসব গান উপভোগ করেন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষকে নাড়া দিচ্ছে এসব গান।

আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি এবং সংস্কৃতিচর্চার চেষ্টা করছি, তখন আমাদের সামনে কবিতার দিকপাল কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ প্রমুখ। আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন তিরিশের পঞ্চপান্ডব কবিবৃন্দ। আধুনিক কবিতা ও আধুনিক সাহিত্যের এক উন্মাতাল তরঙ্গে আমরা ভেসে চলেছি। আমাদের দিনগুলি, রাতগুলি রঙিন তখন আধুনিকতার রঙিন নেশায়। মনে আছে, বাংলা সাহিত্যের ছাত্রদের সামনে কয়েকটি বিকল্প কোর্স ছিল। এর মধ্যে আধুনিক সাহিত্য/লোকসাহিত্য একটা বিষয় ছিল। আমরা বেশ কয়েকজন সরব ছাত্র আধুনিক সাহিত্যের পক্ষে। যারা লোকসাহিত্যর কোর্স নিয়েছিল তাদেরকে দেখা হতো দুর্বল হিসেবে। অর্থাৎ ধরেই নেয়া হতো যে, ভালো ছাত্ররা পড়বে আধুনিক সাহিত্য।

কিন্তু তখনো আমার এ ধারণা ভুল ছিল। এটা বুঝতে একটু সময় লেগেছে। আর এখন সে ধারণা একেবারেই ভেঙে গেছে।

যে কোনো দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে সে দেশের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির মধ্যে। এটাই উত্তর আধুনিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের মূল বিষয়। নিজের ঐতিহ্য, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, লোকসাধনার মধ্যে নিজস্বতাকে আবিষ্কার করাই হলো এর প্রকৃত চেতনা।

লোকসংস্কৃতির সাধনা গ্রন্থে মাসুদ সিদ্দিকী সে কাজটিই করেছেন। মোট তেরটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে এ গ্রন্থটি রচিত। সূচিপত্রটি দেখলে বোঝা যায় তিনি কী কী বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এগুলো হচ্ছে : ফোকলোর, সংস্কৃতির কথা, বাঙালির সংস্কৃতি, সুনামগঞ্জের লোকগান : সামবায়িক সংস্কৃতি, মলুয়া’র আর্থ-সামাজিক পাঠ : পূর্ব ময়মনসিংহ, নারী-সংগীতে নারীর রূপায়ন, মরমী কবি জালালউদ্দিন খাঁ, জয়নুল আবেদিন ও তাঁর শিল্পচেতনা, পূর্ব ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি : সংস্কৃতিময় কথকতা, লোকসাহিত্যে ছড়া : স্মৃতি সুধাময় বেদনা, ও মন তালাশ করো তারে এবং ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি’।

মাসুদ সিদ্দিকীর প্রবন্ধগুলো তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পঠন-পাঠনগত জ্ঞান এবং ক্ষেত্র পর্যায়ে তাঁর সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত ভিত্তি করে রচিত। এতে এ সকল প্রবন্ধ পাঠে একটা আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়।

সুনামগঞ্জের লোকগান : সামবায়িক সংস্কৃতি প্রবন্ধে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ভ্রমণাভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুনামগঞ্জের লোকগান বিশেষ করে কবিগান ও মালজোড়া গান এবং লোককবিদের সম্পর্কে ধারণা দেবার চেষ্টা করেছেন। এখানে রয়েছে লোকগানের অমর স্রষ্টা জালালউদ্দিন খাঁ ও উকিল মুন্সি, সৈয়দ শাহনূর প্রমুখের কথা। এ কথা বলতে গিয়ে তিনি এদের গান সম্পর্কে যেমন আলোকপাত করেছেন তেমনি এদেরকে ঘিরে তৈরি লোকবিশ্বাস ও অলৌকিক আখ্যানের কথাও বর্ণনা করেছেন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এ সকল গীতিকবির গান মানুষ শুধু শ্রবণই করতো না এদেরকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দিব্যজ্ঞানী বলে বিশ্বাস করত। তিনি এসব কবির গানে অন্তর্গত জীবনদর্শনের ব্যাখ্যাও করেছেন। এদের গানের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি নিম্নবর্গের মানুষের কথাও স্মরণ করেছেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,

লোকায়ত কবিরা এভাবে যে গান তৈরি করেছেন তা তারা কোনো মূল্যবান পাত্রে লিখে রাখেননি। সে গান সময়ের ব্যবধানে ক্রমশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ভালোলাগার সে গান নিম্নবর্গের ফকির, আউল-বাউল, কৃষক, মাঝি, রাখালের মুখে মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে সবখানে। তাই এ গানগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট স্রষ্টার নাম পাওয়া যায় না। এ সকল গান এখন হয়ে গেছে সারা সমাজের যৌথ সৃষ্টি ও সম্পদ। এখন এসব অবিনাশী গান ‘প্রচলিত পল্লীগীতির’অভিধা পেয়েছে নাগরিক মধ্যবর্গীয় লোকের কাছে।

এ গ্রন্থের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হলো ‘ও মন তালাশ করো তারে’। এ গ্রন্থে তিনি মূলত জালালউদ্দিন খাঁর গানের দর্শন বিশ্লেষণ করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি সুফিবাদ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন, একই সাথে তিনি বাংলাদেশে ফকির-দরবেশদের বিভিন্ন তরিকা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। জালাল খাঁর গানের দর্শন ব্যখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন :

পির বা মুর্শিদকে অবলম্বন করে স্রষ্টার সঙ্গে চূড়ান্ত মিলন হচ্ছে এর প্রধান উদ্দেশ্য। ‘মিলন’ও ‘ফানা’র সাথে বিচরণ করেন যে মরমি তার একজন অধ্যাত্ম পথ প্রদর্শক প্রয়োজন হয়ে পড়ে। …..পির বা শায়খ হচেছন সুফিবাদেও একান্ত কেন্দ্রীয় বিষয়। তাঁকে কেন্দ্র করে মুরিদ বা শিষ্যের সকল কার্যাবলি আবর্তিত হয়। তিনি দিব্য ক্ষমতাসম্পন্ন।

প্রবন্ধের একটি জায়গায় তিনি ফকিরদের মেজাজ-মর্জি ও জিকির সম্পর্কে ব্যখ্যা করেছেন। এখানে সর্বদা ক্ষিপ্ত ও ক্রুব্ধ অবস্থায় থাকা ‘জালালী ফকির’সম্পর্কেও বলা হয়েছে। অন্য এক স্থানে তিনি জিকির সম্পর্কে বলছেন :

জিকির দুই প্রকার: উঁচু স্বরে জিকির ও মনে মনে জিকির। হালকার জন্য একটি রীতি হচ্ছে গান ও নৃত্যেও তালে সাহায্যে সমাধিভাব সৃষ্টি করা। ইমাম গাজ্জালি সুফিবাদেও জন্য এই রীতির অনুমোদন করেন।….একজন সুফির লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়া। কবিতা, গান ও নাচ হচ্ছে এর আরাধনার মাধ্যম।

এভাবে অজস্র উদাহরণ তাঁর গ্রন্থ থেকে দেয়া যায়। গ্রন্থটি সত্যিকার অর্থে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন একটি ধারা নিয়ে রচিত যা খুব বেশি দেখা যায় না। মরমী ও সুফিবাদ এখনো স্বল্প আলোচিত একটি বিষয়। বাউল গানের আলোচনাও লালনেই সীমাবদ্ধ। মাসুদ সিদ্দিকী লালন-হাসনের বাইরেও বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা লোকগান ও লোককবিদের গানের দর্শন ও তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। মরমী-সুফিবাদের উপরেও আলোকপাত করেছেন। আমি মনে করি বাঙালি জাতি হিসেবে প্রতিটি শিক্ষিত মানুষের উচিত নিজেওে সাংস্কৃতির ঐতিহ্য ও শেকড়কে আবিষ্কার করা। মাসুদ সিদ্দিকীর ‘লোকসাধনার সংস্কৃতি’বইটি পড়লে এ আত্মআবিষ্কারের স্বাদ পাওয়া যাবে।

সর্বোপরি এ গ্রন্থে মাসুদ সিদ্দিকীর ভাষাভঙ্গি নিয়ে দুয়েকটি কথা না বললেই নয়। অসম্ভব কাব্যময় তাঁর ভাষা। এতো চমৎকার কাব্যিক ভাষা একমাত্র উপন্যাসেই মেলে। আমি একটি উদাহরণ দেয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ‘ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানি’নিবন্ধে গ্রামের বর্ণনা :

ধারারগাঁও একটি ছবির মতো গ্রাম। গ্রামটিকে মালার মতো জড়িয়ে আছে বরাক উপত্যকার সুরমা নদী। উত্তরে মেঘালয়ের নীল পাহাড়। জিকির মঞ্জিলের সামনে খোলা দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর। ওপরে আছে আকাশের ওপারে আকাশ। রাস্তার পাশে ডোবা, পুকুরে হেলেঞ্চার ঝোপ। আর আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত ফকিরি-মারফতি, বাউল, ভাটিয়ালি কীর্তনের হৃদয়মথিত, আলোড়িত, বেদনা-বিহ্বল সুর। আবহমান বাংলার লোককাব্য, লোকশ্রুতির বিভাপূর্ণ লোকায়ত উত্তরাধিকার। নদী-হাওর ও লুপ্ত স্মৃতিকাতর প্রান্তরে বাঙালির অভিন্ন সাংস্কৃতিক ভুবন। সর্বোপরি আছে মহামূল্যবান মানবসম্পদ।

গ্রন্থটি প্রকাশ করে ধ্রুবপদ প্রকাশনী সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমি আন্তরিকভাবে এ গ্রন্থের ব্যাপক পাঠ ও পরিচিতি কামনা করি।

লোকসংস্কৃতির সাধনা : মাসুদ সিদ্দিকী, ধ্রুবপদ প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : অক্টোবর ২০১৩, দাম ২৭০ টাকা।

সূত্র : মাসিক উত্তরাধিকার, বাংলা একাডেমি

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
২১,৩৫৭,৭৭১
সুস্থ
১৪,১৫১,২৯৫
মৃত্যু
৭৬৩,৩৮১

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233