মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২০, ০৭:২৭ অপরাহ্ন

হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল কদর 

নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়ঃ শনিবার, ১৬ মে, ২০২০
  • ৪৭০ জন দেখেছেন
ছবি : সংগৃহীত

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান 

আরবি লাইল মানে রাত বা রজনী আর কদর মানে মর্যাদা বা সম্মান। সুতরাং লাইলাতুল কদর অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রজনী বা সম্মানিত রজনী। যাকে আমরা ফারসিতে শবে কদরও বলে থাকি। মুসলমানদের জন্য অতি মর্যাদাপূর্ণ একটি রজনী লাইলাতুল কদর। এই লাইলাতুল কদর তথা শবে কদরের রাতে অজ¤্র ধারায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর বান্দার উপর রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, এ রাতে অগণিত রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসে, ফলে সুবহে সাদিকে পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে অনন্য এক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করে। বান্দা অন্তর খুলে পরশ শ্রদ্ধায় মাবুদের কাছে তার মনের কাকুতি-মিনতি, ভক্তি আর ভালোবাসা সিজদার মাধ্যমে প্রকাশ করে। আল্লাহ তার রহিম রহমান নামের অছিলায় বান্দার প্রতি খুশি হয়ে তার যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

এই রাতটিকে লাইলাতুল কদর নামকরণ করা কেন হলো। কারণ, যেহেতু এ রাতটি অত্যাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমান্বিত, বান্দার পরবর্তী এক বছরের নির্ধারিত ভাগ্যলিপি এ রাতে ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় আর এ কারণেও এ রাতটিকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।

মহিমান্বিত এই রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। কুরআন নাজিলের কারণে এ রাতটিতে যেমন মুসলমানদের জন্য রয়েছে সওয়াব অর্জনের অফুরন্ত সুযোগ তেমনি এ রাতের ফজিলতও অনেক। কুরআনুল কারিমে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি একে (কুরআনকে) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে।  (হে নবী) লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল কদর হলো এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। প্রত্যেক কাজের জন্য এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাইল) অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে। আর এই নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা আল কাদর, ৯৮ : ১-৫)

তাফসিরে মাজহারিতে হযরত ইবনে আবি হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা মহানবি (সা.) সাহাবিদের সামনে বনি ইসরাঈল জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। যারা দীর্ঘ জীবন লাভ করার কারণে অধিককাল ব্যাপী আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা কোনো নাফরমানি করেনি। মহানবি (সা.) মুখ থেকে এ কথা শুনে সাহাবায়ে আজমাইন অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হলেন আর নিজেদের নিয়ে আফসোস করতে লাগলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে আজমাইন এর এই আফসোসের প্রেক্ষিতে এই সূরাটি নাজিল করেন। এ রাতের মর্যাদা যে অনেক সেকথা বোঝানোর জন্য যেমন অসংখ্য হাদিসে এর ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালা এ রাতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে সূরা আল কদর নামে পূর্ণ একটি সূরা নাজিল করেন।

বুখারি শরিফের একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, মহানবি (সা.) বলেন,‘যদি কেউ পূর্ণ ইমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় বিশুদ্ধ নিয়্যতে লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজে অতিবাহিত করে তাঁর পূর্ববর্তী (জীবনের) সকল অপরাধ ক্ষমা করা হবে।’

এই রাতটি সম্পর্কে মিশকাত শরিফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে মহানবি (সা.) বলেন,‘যদি তোমরা কবরকে নূর দ্বারা পরিপূর্ণ পেতে চাও তাহলে তোমরা লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত করো।’ লাইলাতুল কদরে স্বয়ং ইমামুল মালায়েকা তথা ফেরেশতাদের সরদার হযরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের বিশাল একটি দল নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। এ সময় যতোর  নর-নারী নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকেন তাদের সবার জন্য আল্লাহর কাছে রহমতের দোয়া করেন’

ইবনে মাজাহ শরিফে বর্ণিত একটি হাদিসে এ রাতটি রাসূলুল্লাহ  (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর থেকে বঞ্চিত হলো সে যেন সমুদয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। আবু দাউদ শরিফের অন্য একটি হাদিসে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শবে কদর পেলো, কিন্তু  ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে তা অতিবাহিত করতে পারলো না, ঐ ব্যক্তির মতো হতভাগা দুনিয়ায় আর কেউ নেই।

অন্যদিকে তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ শরিফে  উল্লেখ আছে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমি কখনো শবে কদর পাই, তাহলে আল্লাহর নিকট কোন দোয়াটি আমি করবো? তিনি বলেন, তুমি এই দোয়াটি করবে। ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ ( হে আল্লাহ, আপনি অসীম ক্ষমাশীল, ক্ষমা আপনার পছন্দ। অতএব, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।)

লাইলাতুল কদরের ফজিলত অনেক। তাই প্রত্যেক শুকর গুজারি বান্দাকে এই বরকত হাসিলের জন্য সারারাত ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করতে হবে। এই উপলক্ষে বিভিন্ন ইবাদাত যেমন নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, সালাতুস তাসবিহ, কুরআন তেলাওয়াত, দান-সাদকা, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইসতেগফার, দদোয়া-দুরূদসহ সব ধরণের নফল ইবাদাতের প্রতি মনযোগী হতে হবে।

বিভিন্ন জনে বিভিন্ন কথা বললেও বুখারি, মুসলিমসহ অন্যান্য সহিহ হাদিস গ্রন্থে শবে কদরের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। তবে অনেকেই মনে করেন ২৬ রমজানের দিবাগত রাতই শবে কদর। তবে এ ধারণাটির সত্যতা জন্য শক্তিশালী কোনো যুক্তি প্রমাণ নেই। এমনকি ২৭ রমজানের রাত লাইলাতুল কদর হওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্যও নেই। তবে যে কথাটি বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে তা হলো- ২১ রমজান থেকে ২৯ রমজন পর্যন্ত বিজোড় রাতগুলোর যে-কোনো একটি রাতই লাইলাতুল কদরের রাত হতে পারে। তবে লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, আবার আমাকে তা ভুলিয়েও দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতসমূহে তা খোঁজ করবে।’ (বুখারি শরিফ)

যদিও তাফসিরে মাযহারিতে বলা হয়েছে, আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয়ে নয়টি হরফ রয়েছে। আবার সুরা আল কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয় তিনবার এসেছে। সুতরাং নয়কে তিন দিয়ে গুণ করলে সাতাশ হয়। এ কারণে সাতাশে রমজানের রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ কথা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না, ২৭ রমজানের রাতই লাইলাতুল কদর। তাই শেষ দশকের প্রতিটি রাতে বেশি বেশি নফল ইবাদাত করতে হবে। বিশেষ করে বিজোড় রাতগুলোতে।

এ ক্ষেত্রে নবি করিম (সা.) এর একটি হাদিস প্রনিধানযোগ্য, তিনি বলেছেন,‘ লাইলাতুল কদরকে নির্দিষ্ট না-করার কারণ হলো যাতে বান্দা যেন কেবল একটি রাত জাগ্রত থেকে ও কিয়ামুল লাইন আদায় করে ক্ষান্ত না-হয়। আর এ কারণে সেই রাতের ফজিলতের উপর নির্ভর করতে গিয়ে অন্য রাতের ইবাদত ত্যাগ করে না-বসে।’

তাই স্বয়ং নবি করিম (সা.) লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জন করার জন্য রমজানের শেষ দশরাত জাগ্রত থেকে ইবাদতে কাটিয়েছেন। তার উম্মতকেও সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করার কথা বলেছেন। সুতরাং সওয়ার প্রত্যাশী সব বান্দাদের উচিত শেষ দশকের কোনো রাতকে বাদ না দিয়ে পুরো রাত ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়া।

লেখক : সাহিত্যিক ও গবেষক

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
২০,২৯৮,১৫৩
সুস্থ
১৩,২১৮,৩৩৬
মৃত্যু
৭৪০,০৯৫

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233