শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

তুমিই আমার সুমি

নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়ঃ বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০
  • ২১৯ জন দেখেছেন
ছবি : সময় টিভি

আশিক মিজান

তাকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মনে মনে ভাবলাম,আমার মানসপটে যে ছবিটা এতদিন ধরে তুলে রেখেছি এ কী তার কোনো চেনা রূপ। কতদিন তাকে দেখেনি বলে স্মৃতির আয়নায় সে ছবিটা একটু ঝলছে গেছে। মনের পর্দায় যে ধুলোবালি জমা হয়েছিল নিমেষের হাওয়া সবই ধুয়ে-মুছে ছাপ করে দিলো। আমি তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে যাচ্ছি। এতটা নিবিড় তার চাউনি সে যেন আমার জনম জনমের চেনাজানা। চোখের অদৃশ্য আকর্ষণে আমি তার এত কাছে এসেছি আমার মনটা যেন তার কোমল হৃদয়ের স্পর্শ পাচ্ছে। আমার ভিতর আর কোনো ভয় নেই। তার খুব কাছাকাছি যেতে প্রচণ্ড ইচ্ছে জেগেছে আমার। তবুও আমি কাছে যেতে পারি না। একটা অন্তরায় এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে যায়।
মেয়েদের ব্যাপারে আমি বরাবরই একটু ভীতু। এক পা আগালে দুই পা পিছিয়ে যাই। কখনো কখনো মনে হয় মেয়ে মানে ভয়ংকর এমন কোনো জিনিস যা সবকিছুকে দুমড়েমুচড়ে তুলো ধুনো করে ছাড়ে। তবুও মেয়েদের বেলায় আমার যথেষ্ট সুনাম। বন্ধুমহলে আমায় নিয়ে মেয়ে শিরোনামে দু’চার লাইন কবিতাও লেখা হতো। আসলে আমি যে দুষ্ট তা নয়; মেয়েদের প্রতি আমার অন্য এক ধরনের ন্যাকামি আছে যেটা মেয়েদের দারুণ পছন্দ। মেয়েদের নিয়ে আমার ধারণা একেবারে অমূলক কিনা জানি না। তাই এখন থেকে যখনি কারো সাথে সখ্যতা তৈরির কথা ভাবি, আগে দশবার ভেবেনি। ভালো-মন্দের তফাৎ ভালোই বুঝতে পারি। সুমিকে প্রথম দেখাতে আমার ভালো লেগেছে। মনের অনুভূতিগুলো বড়ই বিচিত্র। এর আগে আমি কখনো এমনটা ভাবিনি। ওকে দেখার পর মন থেকে অনেক কথা গর গর করে বেরিয়ে আসছে। কী করে নিজেকে আটকাবো ভেবে পাই না।
সাহস নিয়ে একটু কাছে গিয়ে বললাম, আপনি সুমি ?
কেন বলুন তো ?
আমি আবার বললাম, আপনি সুমি কি না ?
সুমি। তবে ছোট্ট করে অনেকে আবার সুমু বলে।
বেশ কিছুক্ষণ কথার মাধুরী দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বললাম। সে আমার সাথে হ্যাঁ-না মিলিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে আমি বুঝতে পারলাম, সে আমার কথা আর ভালোভাবে নিতে পারছে না। একটা বদঅভ্যেস আছে আমার, একবার বকবক শুরু করলে আর থামতে চাই না। নন স্টপ সার্ভিসের মতো চালিয়ে যেতে একটুও বাঁধে না। তবুও আমি কথা বন্ধ করে বললাম-সুমি, আমি তোমাকে তুমি বলেই সম্বোধন করি।একটু মুচকি হেসে বলল, তাই করুন।
এমন একটা সময় তার সাথে দেখা হবে ভাবতেও পারিনি। সামনে তার বিসিএসের প্রিলিমিনারী পরীক্ষা। তাই ব্যস্ত সময় পার করছে। সে কিছু না-বললেও আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। তাই অযথাসময় নষ্ট না-করে যাবার জন্য উঠে পড়লাম, ঠিক তখনি সুমির এক বান্ধবী বলল-এ পরীক্ষাটা ওর জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। তার বলার ভঙ্গিটা সাধারণ ছিল না। চ্যালেঞ্জ শব্দটা আমায় একটু ভাবিয়ে তুলল। আমি জানতে চাইলাম এর রহস্য, কিন্তু না-পারি সুমিকে জিজ্ঞেস করতে, না তার বান্ধবীকে। দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষণিকের পরিচয়ে এতদূর এগিয়ে যাওয়াটা আমি সঙ্গত মনে করলাম না। তাই ওখানেই চুপ হয়ে গেলাম। আর কিছুই জানতে চাইলাম না।
শাহবাগ মোড়ে আমি তাকে প্রথম দেখেছিলাম। তখন আমি ঢাকা বিশ্বেবিদ্যালয়ের ছাত্র। সে-ও মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। রোকেয়া হলে থাকে। আমি থাকি এসএম হলে। সেদিন থেকেই আমার হৃদয়ে একটু একটু করে ঠাঁই করে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে কথাও হতো দুজনার।
হঠাৎ বাবা মারা যায়। আমিও গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। দুর্ভাগ্যবশত সুমির মোবাইল নম্বরটাও হারিয়ে ফেলি। সুমি আমাকে কখনো কল করতো না। সবসময় আমিই তাকে ফোন দিতাম।আমি বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম তখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। বেশ কয়েকদিন ধরে রোকেয়া হলের গেটের বাইরে সকাল-সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার ধারণা ছিল, হয়তো সুমি হলেই থাকবে। আর হলে থাকলে তার সাথে দেখা হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার সাথে আর দেখা হলো না। এদিকে হাতে আর সময় নেই। চাকরির সুবাদে ঢাকা শহরকে বিদায় জানাতে হলো। পর করতে হলো নিজের চিরচেনা ক্যাম্পাসকে। হারাতে হলো সুমিকে।
আমি যে কতটা ছেলেমি করেছি ভাবতেও কষ্ট হয়। প্রেমে পড়লে মানুষ মনে হয় এরকম বোকা বোকা হয়ে যায় ? অনেক চেষ্টা করেও তার সাথে দেখা হলো না। মাঝখানে কেটে গেল অনেকগুলো বছর। একপর্যায় সুমিকে ভুলতে বসলাম। মনের মধ্যে নতুন কিছু বাসা বাঁধতেও শুরু করল। কিন্তু নিজের কাছে নিজেই হেরে গেলাম। আর সামনে এগোতে পারলাম না। ঘুরেফিরে সেই পুরনো স্মৃতিকেই ধরে রাখলাম।কেটে গেল অনেক সময়। তবুও আশা ছাড়িনি। সে হয়তো আবার একদিন আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। মনে মনে কেবল এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম; আজকের দিন আর সেদিনের মধ্যে ব্যবধানটা যদি অনেক বেশি হয়ে যায়। তাহলে কি আমার পক্ষে তাকে ধরে রাখা সম্ভব হবে ? সময়ের হাতে নিয়তিকে ছেড়ে দিলাম। এছাড়া আর কীইবা করতে পারতাম আমি।
শিক্ষক হিসেবে মাত্র যোগদান করেছি। কলেজে প্রচুর কাজের চাপ। এ্যানুয়াল ফাংশন, নবীনবরণ, বিশিষ্টজনদের সংবর্ধনা। এসব করে করে সময় চলে যাচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে পরীক্ষার ডিউটি। সময় বের করা আমার জন্য বড়ই মুশকিল।
চাকরি সূত্রে দুজনে প্রায় পাশাপাশি এসে পড়েছি। পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সুমি এখন আমার বেশ কাছে। সে একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নন ক্যাডার হিসেবে যোগদান করেছে। আর আমি সরকারি কলেজে। দুজনের বাসা জেলা সদরে। তাকে দেখার জন্য মনটা বড় উতলা হয়ে উঠেছে। সেই যে একনজর দেখেছি তাও অনেকদিন হলো।
মনে মনে আমি আশংকা করতে লাগলাম সুমি কি আমায় চিনতে পারেনি ? অবশ্য আমার কাছে মনে হলো তার চোখের ভাষা, মুখের কথা সবই যে আমার দিকে ইঙ্গিত করছে। তাহলে সে আমাকে নিশ্চয়ই ভোলেনি। আর চিনতেও পেরেছে। কিন্তু আমি তাকে নিজের পরিচয় দেইনি। বেশ কিছুদিন আগের নানাকথা ভাবতে লাগলাম। আর মেলাতে চাইলাম আমার সেই চেনা মানুষটির সাথে। তবুও মনে ধাঁধাঁর সৃষ্টি হয়। কিছুতেই এই জট খুলতে চায় না।
আমার সেল ফোনে একটা কল এলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কে? তখনি কে যেন হা হা করে হেসে উঠল। বলল, এখনো চিনতে পারনি আমায়। কী করে চিনবে? আমি সুমি। তোমার সুমি। আমি অবাক হলাম! আর ভাবতে লাগলাম, আমি যে কেবল তাকে নিয়ে ভাবছি তা নয়; সে-ও আমাকে নিয়ে ভাবছে। তারপরেও বললাম, এত অল্প সময়ে আমার নম্বর কীভাবে সংগ্রহ করলে।
আসলে তুমি বোকার মতো কথা বলছো। আমি বললাম, তুমি ঠিক ধরেছ। তা না হলে নিজের মানুষকে কেউ এভাবে হারিয়ে ফেলে। কথার ছলে যা বলি না কেন মনে মনে আমার প্রচণ্ড রাগ হলো তার উপর। আমি না হয় তোমার নম্বর হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু তুমি ? একটি বারও কি মনে হয়েছে আমার কথা ?আমার অবস্থা বুঝতে পেরে এবার সুমি নরম হতে শুরু করল। দেখ, আমি স্বীকার করছি আমি ভুল করেছি। সে ভুলেরও নিশ্চয়ই একটা কারণ থাকবে।
তার সবকথা শোনার পর নিজের ভিতর থেকে রাগটা একটু একটু করে কমতে লাগল। তবে সন্দেহটা বেড়েই চলল। কী এমন বাধা যার জন্য সে আমার খোঁজ নিতে পারেনি। সে আমার থেকে কী আড়াল করতে চাইছে।
তাকে অপূর্ব লাগছে। টোলপরা গাল, চামড়ার ভাজে লুকিয়ে থাকা হাসির দৃশ্য সবই অন্যরকম। এতদিনে সে নিজেকে অনেক বদলে নিয়েছে। তার সুরভিত রূপের মাধুর্য আমায় পাগল করেছে। সেই প্রথম দেখা, এরপর হারিয়ে যাওয়া, আবার তার আবির্ভাব কিছুতেই আমি তাকে ভুলতে পারি না। তাকে পাবার জন্য আমার মন উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। আমি আর তাকে হারাতে চাই না। তাই আমি বললাম-সুমি, এই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমরা এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে চাই সেখান থেকে আর কখনো পিছিয়ে যাবার কথা ভাবতে হবে না।
সুমি কিছু বলল না। চুপ করে রইল। সে জানাতে চাইল এই মুহূর্তে ক্যারিয়ার ছাড়া সে অন্যকিছু ভাবছে না। এজাতীয় ভাবনা ইদানীং তার কাছে খুব একটা গুরুত্বের দাবি রাখে না। আমি আবারও বললাম, আমি তোমার জন্য অনেকটা বছর অপেক্ষা করেছি। তুমি যদি বলো আমি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করব। তবুও আমি তোমার পথ চেয়ে থাকব। সুমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, সত্যি তুমি আমায় ভালোবাস ?
আমি ব্যথিত কণ্ঠে তাকে বললাম, এতদিন পরে এ কেমন প্রশ্ন করলে! তার একথাটা আমায় খুব আঘাত করল। একপ্রকার অপমানিতও বোধ করলাম। আমি তাকে এড়িয়ে যেতে চাইলাম। সবকিছু বুঝেও না-বোঝার ভান করলাম। সুমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। আমি আর কথা বাড়ালাম না। ফোনটা রেখে দিলাম। সে বারবার ফোন করলেও আমি তুললাম না।
বেশ কয়েকদিন হলো তার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি নিশ্চিতভাবে ধরেই নিয়েছি, এবারও আমি হারতে চলেছি। তাই পরাজিত হবার ভয়ে আগেই নিজে সংযত হলাম। নিজেকে গুটিয়ে নেবার সবরকম চেষ্টা করতে লাগলাম।
হঠাৎ একদিন দেখতে পেলাম, সুমি আমার কলেজে। ওকে দেখে আমি রীতিমতো চমকে উঠলাম। আমি মাত্র ক্যাম্পাসে পা রেখেছি। আজ একটু সকাল সকাল এসেছি। মাঝেমধ্যে ক্লাস না থাকলেও এরকম সকাল সকাল আসি। ডিপার্টমেন্টে এসে কাজ করতে ভালো লাগে, তাই একটু সময় পেলেই স্টাডির কাজে লেগে যাই। কখনোবা খাতা কলম নিয়ে পত্রিকার জন্য দু’চার কলাম লিখে ফেলি। আমার লেখালেখির কাজটা এভাবেই চলে।
ওকে দেখে মনে হলোও কাউকে খুঁজছে। আমি দেখেও না-দেখার ভান করলাম। জানি না, ও, আমাকে দেখেছে কিনা। আমি সুমির সাথে দেখা করতে চাই না। এতদিনের প্রচেষ্টায় নিজেকে এটুকু সংযত করতে পেরেছি। আমি আমার সহকর্মীকে ডেকে বললাম-ওই যে দেখছ মেয়েটা, ওযদি আমায় খুঁজতে আসে বলে দিও আমি ক্যাম্পাসে নেই। অথবা আমার ব্যাপারটা একটু সামলে নিও। আমার সহকর্মী আগে থেকেই আমার ব্যাপারে সবকিছু জানে। সুতরাং তাকে খুলে বলতে আমার কোনো বাধাই ছিল না। যা তাকে করতে হবে সেভাবেই আমি তাকে বললাম।
সুমি নিশ্চয়ই জেনেছে আমি আজকে ডিপার্টমেন্টে থাকব। আর সে কারণে এত তাড়াতাড়ি সে চলে এসেছে। প্রথমেই দেখা হয়ে যায় আমার সহকর্মী মঈনের সাথে। আমার শিখানো কথাগুলো উগড়ে দিলো মঈন। এমনভাবে সাজিয়ে বলল কথাগুলো আমার মনে হয় না সুমি আর দ্বিতীয়বার এখানে আসবে। সে বুঝতে পারল,আমি তার সাথে দেখা করতে চাই না। তার চেহারা দেখে মনে হলো সে আমার এহেন আচরণে ব্যথিত তো হয়েছে; সেইসাথে কিছুটা লজ্জাও পেয়েছে।
চলে গেল সুমি। তার সাথে আর কোনো পরিচয় নেই। আমিও বিদায় জানালাম এই শহরকে। কেটে গেল কয়েক বছর। জানি না, সুমি কোথায় আছে। এখন আর আমি তার খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করি না।
বাবা রক্ষণশীল মানুষ। আমাকে বিয়ে করানোর জন্য অনেক আগে থেকেই চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু কিছুতেই আমি রাজি হচ্ছিলাম না-বলে বাবা সুবিধা করতে পারেনি। চাপ ইদানীং বেড়েই চলেছে। এবার কেবল বাবাই নয়, সাথে যোগ হয়েছে মা। মায়ের কথা ফেলতে পারলাম না। শেষপর্যন্ত রাজি হতে হলো।
বাবা-মাকে সাফ সাফ এ-ও জানিয়ে দিলাম বিয়ে আমি কাকে করব এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তোমরা যাকে বিয়ে করতে বলবে তাতেই আমার মত। আমার মিষ্টি বোনটা ভারি চালাক। ওর আসল নাম বৃষ্টি। আমি আদর করে ওকে মিষ্টি বলে ডাকি। ও আমার মনের কথা খুব ভালো বুঝতে পারে। ইশারায় ও আমায় কীযে বলল আমি কিছুই বুঝলাম না। তবে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলেও ও আমায় বিষয়টা চাপিয়ে গেল। আমি মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই ওরা সাকিরার কথা ভাবছে। সাকিরা আমার মামাতো বোন। দেখতে যেমন রূপেও তেমন। মা তো সবসময় ওর কথা বলতো। তাছাড়া মামার প্রতি মায়ের আলাদা একটা টান।
বাবা-মা বারবার মেয়ে দেখার কথা বলছে। আমিও বারবার এড়িয়ে যাচ্ছি। জিদ ধরেছি, মেয়ে আমি দেখবোই না। আমার উদ্ভট আচরণে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আত্মীয়রাও দু’চার কথা বলতে শুরু করেছে। এ কেমন ছেলে ? বিয়ের পরে যখন বউ পছন্দ হবে না তখন সব দোষ গিয়ে পড়বে বাবা মায়ের উপর। মেয়ে নিয়ে কে এমন বিপদে পড়েছে ছেলেকে না-দেখে সম্বন্ধ করতে যাবে ?
ছোটকাল থেকেই আমি একরোখা। যা বলি তা করি। কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসেছিলাম, কিন্তু বিয়ের যন্ত্রণায় অল্প কদিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে হলো। একসময় বাবা আমাকে জানিয়ে দিলেন তোমার জন্য আমরা মেয়ে ঠিক করেছি। বিয়ে করতে হবে তোমাকে। আমি অবাক হয়ে গেলাম, এমন বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হলো কোন কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা। বিয়ের ঠিক একদিন আগে বাড়ি এলাম। দুজন লোক এলো আমার বাড়িতে। একনজর দেখল আমায়। যাবার সময় কটি প্রশ্ন করল। তারা যা জানতে চাইল আমি তার থেকে একটি বেশি কথাও বললাম না, আর কমও করলাম না।
রাত পোহালে বিয়ে। চারিদিকে ধুমধাম। অতিথিতে গমগম করছে বাড়ি। কন্যা সম্পর্কে এখনো আমি কিছু জানি না। তবে নামটা জেনেছি, সাথে গ্রামটাও। কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। জীবনে বোধহয় এ মেয়ের নাম প্রথম শুনলাম। বাড়িও অনেক দূরে, কয়েক জেলা পেরিয়ে। এবার আমার কাছে মনে হলো বাবা আমার ন্যাকামির যোগ্য জবাব দিতে চলেছেন। এখন আমি না-ও বলতে পারি না।

চললাম বউ আনতে। মনে কোনো বাড়তি অনুভূতি নেই, আছে ব্যথা। মুখটা গোমরা করে বসে আছি। যে-ই দেখছে কিছুটা অবাক হচ্ছে। পাশ থেকে ছোট বোনটা বলে উঠল কীরে বর চলছিস কোথায় ? আমি বললাম, চুপ কর মিষ্টি। মিষ্টি হেসে দিলো। আমার কান্নায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু আমি প্রকাশ করতে পারছি না। এবার নিজেকে নিজে দোষারোপ করতে লাগলাম, সবই হয়েছে আমার জন্য। আমার জিদ আমাকে আজ মরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাথাটা ভারি হয়ে আসছে। সবকিছু ঘোলাটে লাগছে। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা পর পৌঁছলাম কনের বাড়িতে। বসলাম বিয়ের আসবে। এখন মনটা ছটফট করছে আর বারবার সুমির কথা মনে পড়ছে। মন চাইছে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যাই। কিন্তু পালাতে পারলাম না। আজ সবকিছু ভুলে বাধ্য ছেলের মতো বাবার কথা শুনব বলে স্থির করলাম। আজ প্রথমবার ভাগ্যকে ছেড়ে দিলাম তার স্বাভাবিক গতিতে। তাকে ফেরানোর চেষ্টাও করলাম না। শুধু বিনয়ের সাথে মন দিয়ে খোদাকে এই কথা বললাম, আমি আঘাত পেয়েছি তাই সব সয়েও বাবাকে বড় করতে চেয়েছি,তাদের মতামতের গুরুত্ব দিয়েছি তুমি আমায় অপমানিত করো না প্রভু। আমাকে সহ্য করার ক্ষমতা দাও।
খাওয়াদাওয়া শুরু হলো। আমি মুখে খাবার তুলছি না কী করছি বুঝতে পারছি না। খুব কষ্টে কয়েক লোকমা নিজের অজান্তেই পেটের মধ্যে ঢুকে গেল। নানারকম চিন্তা আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বরের আসনে বসে রইলাম। সময় যে কিছুতেই কাটছে না। আমি একটা পাথরের মূর্তিতে পরিণত হতে চলেছি। প্রাণ থেকেও আজ নিজেকে নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে। হঠাৎ কজন এসে বলল, বরকে নিয়ে ঘরে চলুন। চারদিকে লোকভর্তি। আমার মুখখানায় কালো অন্ধকার। আমার শ্বশুর অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। পিঠের উপর হাত রেখে বললেন-বাবা জাফর, মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। সুমি বড় মিষ্টি মেয়ে। পরম আদরের।
সুমির নাম শোনার পর আমার শিরা-উপশিরায় শিহরণ ধরে গেল। আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। এবার সত্যি আমি চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, আমার সামনে বসা রয়েছে আমার সেই সুমি। আমি তার দিকে একনাগারে তাকিয়ে রইলাম। লজ্জা শরম বলতে সবই আমি জলাঞ্জলি দিয়েছি। আমি নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না। উপস্থিত লোকজনের মধ্যেই জড়িয়ে ধরলাম তাকে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
২১,৩৫৪,৬৮৯
সুস্থ
১৪,১৪৭,৯২৫
মৃত্যু
৭৬৩,৩৫৩

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233