মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন

যে কারণে কুরআন বোঝা আবশ্যক

আশিক মিজান
  • প্রকাশের সময়ঃ সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০
  • ৩৭৬ জন দেখেছেন
ছবি : সংগৃহীত

আশিক মিজান

আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও জ্বিনকে একমাত্র তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তিনি তাদের সৃষ্টি করেননি। এই মানুষ যদি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার না-করে আপন গোমরাহী আর অহঙ্কারীর কারণে বিপদগামী হয়, যার ফলশ্রুতিতে সে জাহান্নামে চলে যায় তাতে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে না। বরং মানুষ নিজেকে নিজে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেবে। অপরদিকে কেউ যদি নেক আমল করে জান্নাতবাসী হয় তাতেও আল্লাহর কোনো লাভ নেই। আল্লাহ পরম দয়ালু, অসীম করুণায়, তাই তিনি চান না, তাঁর কোনো বান্দা জাহান্নামী হয়ে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করুক। তাই মানুষের উচিত স্রষ্টার আনুগত্য স্বীকার করে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদাত করা। এরপরেও যারা তাঁর আনুগত্যকে অস্বীকার করে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তাদের প্রতি তিনি শেষ বিচারের দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হবেন। তিনি কারো প্রতি অবিচার করবেন না। যেহেতু তিনি আহকামুল হাকিমীন।
আল্লাহকে অস্বীকারের পরিণতি, পার্থিব জীবনের কার্যাবলী সম্পাদন, আখিরাতের কল্যাণ অর্জন সহ মানুষ তার সার্বিক কর্মগুলো কীভাবে পরিচালনা করবে তারই একটি সুন্দর ও যুগোপযোগী গাইডলাইন হলো আল-কুরআন। এটি যেমন খোদা প্রদত্ত একটি আসমানি গ্রন্থ তেমনি মানুষের জন্য এটি একটি উপদেশ। যাঁরা হেদায়েত চাইবে তারা এটিকে সাদরে গ্রহণ করবে। আর তাদের জন্য এ কুরআন কল্যাণ বয়ে আনবে। ফলে যে-কোনো ধরণের শয়তানের দ্বারা সে প্রতারিত না-হয়ে আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে পারবে।
এ কারণে বলা হয়, কুরআন মানুষকে আলোর পথ দেখায়, যে পথে রয়েছে মানুষের মুক্তি। এই কুরআন কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য অবতীর্ণ হয়নি। এটি একটি সার্বজনীন গ্রন্থ। যা সকল মানুষের জন্য পথ নির্দেশক। কুরআনকে জানার ও বোঝার সৌভাগ্য সবার হয় না। এ গ্রন্থ থেকে হেদায়েত লাভের সৌভাগ্য ঐ সমস্ত মানুষের হয় যাঁদের উপর আল্লাহর খাস রহমত রয়েছে। তাঁরাই কুরআনকে মানে, আল্লাহর আনুগত্য করে। এঁরাই সৌভাগ্যবান। কুরআন তাঁদের জন্য মাহাত্ম্যের দ্বার খুলে রেখেছে। যে কেউই চাইলে এর অনুসরণ ও অনুকরণ করতে পারে। বিশ্বমানবতাকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যই এর আগমন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন,‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, এ কুরআন মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ ও সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন আর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সূরা আল-বাকারা, ২ : ১৮৫)
যারা পরকালীন মুক্তি চায়, জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচতে চায়, এমন সব মানুষের উচিত কুরআনের আলোকে জীবন গড়া। এঁর নির্দেশিত পথে জীবনকে পরিচালনা করা। নিজে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচা। অন্যকেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো। তবেই জীবন হবে সুন্দর। প্রতিষ্ঠিত হবে সুন্দর সমাজ। দূরীভূত হবে সব ধরণের হিংসা-দ্বেষ, কলহ-বিবাহ। শুনতে হবে না আর অভাব-অনাটন, অন্যায়-অত্যাচারে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের হাহাকার। সৌহার্দ্য আর ভালোবাসার বন্ধনে ভরে উঠবে মানুষের জীবন। এটাই কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব।
কুরআনের প্রথম কথাই হচ্ছে ‘ইকরা’। অথাৎ পড়ো। সবার আগে আল্লাহ রব্বুল আলামিন পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু কোনো কিছু উপর আমল করতে হলে সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হয় তা হলো সেই বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা। তা না-হলে অজ্ঞতার দরুণ অনেক সময় সঠিক কাজটিও ভুল প্রক্রিয়ায় সম্পাদনের ফলে সওয়াবের পরিবর্তে শয়তান আমাদের কাজটি ত্রুটিযুক্ত করে পাপের ভাগিদার করতে পারে। মানুষকে দিয়ে শয়তানের কাজটি হয় অত্যন্ত সূক্ষভাবে। মানুষভেদে শয়তানের কৌশলও পরিবর্তন হয়। তাই শয়তানকে এড়াতে সবসময় মানুষকেও থাকতে হবে সাবধান। এজন্য আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়ে দিলেন তোমরা জেনে-বুঝে সঠিকভাবে আমল করার জন্য অধ্যয়ন করো। চিন্তা করো। আল-কুরআনের এই নির্দেশনামূলক আয়াত আরো প্রমাণ করে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। যে জ্ঞান হবে জীবনধর্মী, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তরিকা অনুযায়ী, যা দ্বীনি জীবন যাপনে সহায়ক। সুনান ইবনে মাজা-তে এ কারণে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে মহানবি (সা.) বলেন,‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ।’
সুতরাং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানতে হলে মানুষকে অবশ্যই বৈশ্বয়িক জ্ঞানের পাশাপাশি কুরআনের পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাই উভয় ধরণের এই জ্ঞানকে আল্লাহ তার বান্দার জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। সুনান আত-তিরমিজি-তে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে মহানবি (সা.) বলেন, ‘তোমরা কুরআন ও ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করো আর মানুষদেরকে তা শিক্ষা দাও কেননা আমাকে উঠিয়ে নেয়া হবে।’
যারা মনে করে, কুরআন একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত সহ নির্দিষ্ট কতিপয় ইবাদাতের মধ্যে এর কর্মপরিধি সীমাবদ্ধ, তারা বুঝে হোক আর না-বুঝে হোক কুরআনকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এ ধরণের কল্পনাপ্রসূত চিন্তা-ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং কুরআনকে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে মেনে নিয়েই জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। তাহলেই কুরআনের সার্থকতা। তখনই কুরআন মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। একজন মানুষ যদি কুরআনকে সত্যিকার অর্থে জানার জন্য চিন্তা গবেষণা করে তাহলে এই কুরআন তাকে আলোর দিকে নিয়ে যাবে। যে নূরে নূরান্বিত হয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম। বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্প সাহিত্য সহ জ্ঞানের সকল শাখা প্রশাখাতে আল-কুরআন তাঁকে পৌঁছে দেবে এক অসামান্য উচ্চতায়। মরু আরবের নিরক্ষর বেদুঈনরা যখন কুরআনের সংস্পর্শে এলো, রাসূল (সা.) এর সান্নিধ্য লাভ করলো, তাঁরা স্বীকৃতি পেলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে।
আমরা অনেকেই কুরআন পড়ি, কিন্তু কতটুকু বুঝতে পারছি কুরআনকে? হয়তো কখনো বোঝার চেষ্টা করি না। এঁর দ্বারাই দুনিয়ার কর্মনিষ্ঠ ও তাকওয়া সুলভ আচরণ মানুষকে উত্তম মানুষে পরিণত করতে পারে। কুরআনী জীবনপদ্ধতির অনুকরণ ও অনুসরণের যেমন প্রতিষ্ঠিত হতে একটি সুন্দর সমাজ তেমনি একটি সুন্দর রাষ্ট্র। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখলে পাই, সাহাবায়ে আজমাইন হযরত আবু বকর (রা.) থেকে শুরু করে হযরত আলী (রা.) এর সময়কার ইসলামি শাসন ব্যবস্থা। যা সর্বকারের শাসকদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। এই শাসন ব্যবস্থার অভূতপূর্ব সাফল্য কোনো মানুষের কৃতিত্বের জন্য নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আল-কুরআনের অবদান। কুরআনই নিশ্চিত করেছে মানুষের মর্যাদা, দায়িত্ব জ্ঞান ও জবাবদিহিতা।
যদি আমরা কুরআনের পূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণ করি, তবেই আমরা কুরআন মেনে চলার সুফল লাভ করতে পারবো। মানব রচিত মতাদর্শ আর কুরআনিক মতাদর্শ এ দু’য়ের সমন্বয়ে যদি তৃতীয় একটি মনগড়া মতাদর্শ দাঁড় করিয়ে এর অনুসরণ করি, তাহলে কুরআন কখনো আমাদের জন্য রহমত বয়ে আনবে না। বরং এর পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা আল বাকারার পঁচাশি নম্বর আয়াতে বলেন,‘তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের একাংশে বিশ্বাস করো আর আরেক অংশ অবিশ্বাস করো? কখনো যদি কোনো ব্যক্তি এ আচরণ করে, পার্থিব জীবনে তাদের লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে, পরকালেও তাদের কঠিনতর আজাবের দিকে নিক্ষেপ করা হবে, তোমরা যা করছো, আল্লাহ তায়ালা সেসব কিছু থেকে মোটেই উদাসীন নন।’
আমরা যখন কুরআন পড়ব অবশ্যই তা বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে কুরআনের প্রতি অন্তরে এক ধরণের ভালোবাসা তৈরি হবে। এ ভালোবাসাই কুরআন কেন্দ্রিক জীবন গঠনে সহায়ক। মানুষ যখন কোনো ভালো কাজ করতে যায় তখন ইবলিস তাতে বাধা প্রদান করে। কিন্তু যখন কোনো মানুষ কুরআন পড়তে বা বুঝতে চায় তখন শয়তান এত বেশি বাধা প্রদান করে যা অন্য কোনো ভালো কাজের সময় করে না। এর কারণ? মানুষ যাতে কুরআন বুঝতে না-পারে। একবার যদি মানুষের অন্তর কুরআনের শিক্ষায় উজ্জেবিত হয়, তাহলে তার দ্বারা যেমন পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হবে না তেমনি অন্যরাও যাতে পাপ কাজে লিপ্ত হতে না-পারে সে বিষয়েও সে সোচ্চার হয়ে উঠবে। তাই মুসলমানরা কুরআন থেকে দূরে থাকলে শয়তান বেশি খুশি হয়। এজন্যই আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআন অধ্যয়নের সময় শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন। বর্তমান সময়ে মানুষের অন্তরে কুরআনের প্রতি আকর্ষণ কমেছে। আকর্ষণ বেড়েছে শরিয়ত বিরোধী শয়তানি কাজগুলোর প্রতি। যার মধ্যে কল্যাণ নেই তাকেই মনে করা হচ্ছে কল্যাণের বিষয় হিসেবে। দিন দিন তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকে যাচ্ছে সেদিকে। যদি আপনি মনে করেন, কুরআন পড়তে, কুরআন শুনতে, কুরআন বুঝতে ও কুরআন নিয়ে গবেষণা করতে আপনার ভালো লাগছে না, আপনার আকর্ষণ অন্যদিকে, তখন অবশ্যই বুঝে নিতে হবে আপনি শয়তানের ধোঁকায় পড়েছেন। তাহলে আপনাকে অনুরোধ করবো, শয়তানকে কোনো প্রশ্রয় না-দিয়ে কুরআনের দিকে ফিরে আসুন। কারণ, কুরআনেই বরকত, কুরআনেই নাজাত।
কুরআনের পথে যারা চলবে এই পথই তাদের জন্য মুক্তির বারতা নিয়ে আসবে। খুঁজে পাবে জীবনের এক নতুন দিগন্ত। কুরআনের খাদেমদের দুনিয়াতে যেমন সম্মান রয়েছে তেমনি আখিরাতে আছে তাদের জন্য অনাবিল শান্তির নিশ্চয়তা। যদি কাফির-মুশরিকরা তাদের ভুলন্ঠিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুতিই সত্যে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘অবশ্যই এ কুরআন এমন একটি পথের নির্দেশনা দেয় যা সবচেয়ে সরল আর যে মুমিনগণ নেক আমল করে এ কিতাব তাদেরকে এ সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে এক মহাপুরস্কার। অপরদিকে যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য জাহান্নামের কঠিন আজাব প্রস্তুত করে রেখেছি।’
আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাকে দুনিয়াতে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। যুগ ও কালের পরিক্রমায় নবি-রাসূল থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম সহ কেয়ামত পর্যন্ত যাঁরা কুরআনের দাওয়াত নিয়ে মানুষের কাছে গিয়েছেন বা যাবেন তাঁরা নানারকম জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ও হবেন এটাই চিরন্তন। এটাই কুরআন বলছে। তবু দ্বীনের দায়ীদের কুরআনি দাওয়াত থেকে ফেরানো যাবে না। যে মানুষটি কখনো জীবনে মিথ্যা কথা বললেন না, মানুষকে কষ্ট দিলেন না, আমানতের খেয়াত করলেন না, মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে মেনে নিতেন, সেই মানুষটি যখন নবুয়ত প্রাপ্ত হয়ে দ্বীন তথা কুরআনের দাওয়াত দিলেন তিনি পরিণত হয়ে গেলেন চরম শত্রুতে। এমনকি তাঁকে প্রাণে মেরে দিতে চাইল। কি অপরাধ তাঁর?
সুতরাং কুরআনের পথে হাঁটতে গেলে, মানুষকে এই পথের দিকে আহ্বান করলে শয়তানি শক্তি এর বিরুদ্ধে অবশ্যই দাঁড়িয়ে যাবে। এরপরেও যারা অন্ধকারের পথ ছেড়ে কুরআনের পথে আসতে চাইবে কুরআন তাদের অবশ্যই স্বাগত জানায়। তাইতো আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদা’য় বলেছেন,‘অবশ্যই তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আলোকবর্তিকা ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর দ্বারা আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর তাদেরকে তিনি সঠিক পথে পরিচালিত করেন।’
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষ বিপদগামী হয়ে যেতে পারে। তাই পথভ্রষ্ট এই মানুষগুলোকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন। মুহাম্মদ (সা.) এর পর পৃথিবীতে আর কোনো নবি-রাসূলের আগমণ ঘটবে না। কারণ, আমাদের মাঝে এমন এক আসমানি কিতাব আল-কুরআন রয়েছে যার গ্রহণযোগ্যতা থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। এই কুরআন ও সুন্নাহ এর মাঝেই মানুষ খুঁজে তাদের সব সমস্যার সমাধান। এ দুটো জিনিসই মানুষকে মুক্তির দিশা দেবে। অরো রয়েছেন ওলামায়ে কেরাম। যাঁরা নবিদের উত্তসূরী। তাঁরা দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন।
মানুষের আছে বিবেক। চিন্তা গবেষণা করার শক্তি। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আল্লাহকে জানা ও বোঝার জন্য হাজারো নিদর্শন। এমনকি মানুষের শরীরে এমন কিছু নিদর্শন রেখেছেন যা আল্লাহকে চেনার জন্য যথেষ্ট। যদি মানুষ এগুলো নিয়ে চিন্তা করে। এতসব কিছুর পরেও যারা কেবল দুনিয়া দুনিয়া করে নিজেদের অস্তিত্বকে ভুলে গিয়েছে, স্রষ্টাকে চিনে নেয়ার সুযোগ থাকলেও তাঁকে চিনে নিতে পারলো না, তারা আসলেই হতভাগা। মৃত্যুর পরে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। তাই জেনে-বুঝে যারা কুরআনের সাথে দুশমনি করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে হেদায়েত চায় দুর্ভাগ্য তাদের।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিবকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তিনি মাক্কি ও মাদানি জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন এই কাজে। তাঁর মিশন ও ভিশন-ই ছিল আল-কুরআনকে ঘিরে। শুধু দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যেই তিনি ইসলামের দুশমনদের নানা অত্যাচার সহ্য করেছেন। হিজরত করেছেন। তাঁর সাহাবিগণ অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন। শুধু একটি কারণে, দ্বীনকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। আল্লাহকে খুশি করতে চেয়েছেন। প্রকৃত মুমিন তো তাঁরাই যাঁরা নিজেদের জান-মাল ও সন্তান-সস্তুতির চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসে। এই কুরআন হচ্ছে সেই কিতাব যাতে রয়েছে একজন মুমিন ব্যক্তির প্রাণশক্তি। যে এর বাইরে কিছু ভাবতে চায় না, করতেও চায় না। এই কুরআনকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমার প্রিয় নবিকে উহুদের প্রান্তরে রক্ত ঝরাতে হয়েছে। শত শত সাহাবিকে এই দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে।
কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকরাও এই কুরআনের বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়ালেও অবশেষে বিজয় হয়েছে কুরআনের। সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ¦ যতই প্রকট হোক না কেন, সত্যের বিজয় সুনিশ্চিত । এ প্রসঙ্গে সূরা আস-সফ’এ আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যেন তিনি দুনিয়ার সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দিতে পারেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’
বিশ^ মানবতার জন্য কুরআন মুক্তির বারতা নিয়ে এসেছে। যারা একে অনুসরণ করে মুক্তির দিশা পেতে চায়, কুরআন তাদের সঠিক পথ নির্দেশ করে। যারা এই কুরআনের হুকুম বাস্তবায়নের জন্য দ্বীনের দাওয়াত দেয় তাদের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে মহা পুরস্কার। এ প্রসঙ্গে সূনান আত-তিরমিযি-তে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল-কুরআন অধ্যয়ন করবে আর একে প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করবে, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হালালকে হালাল হিসেবে মেনে নেবে, হারামকে হারাম হিসেবে জানবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর পরিবারের এমন দশজনের জন্য জান্নাতের সুপারিশ করার অধিকার দিবেন যাদের সকলের ব্যাপারে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো।’
যখনি মানুষ কুরআনমুখী হয় শয়তানও ঐ মানুষমুখী হয়। তার তৎপরতাও বহুগুণে বেড়ে যায়। শয়তান চায় মানুষের আকর্ষণ যেন কুরআন ছেড়ে অন্য কোনো মন্দ কাজের প্রতি হয়। এজন্য সে ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। কারণ শয়তান জানে, মানুষ যদি একবার কুরআনের স্বাদ পেয়ে যায়, তাহলে তাকে দিয়ে আর অপকর্মগুলো করানো সম্ভব হবে না।
অনেকে কুরআন পড়েন, কিন্তু কুরআনের তেলাওয়াতের মাধ্যমে যে একটা স্বাদ উপভোগ করা যায় তারা সেটি পান না। কুরআনের যেহেতু আমাদের মাতৃভাষায় নয়, আরবি ভাষায় নাজিলকৃত, তাই হাতেগোনা কিছু মানুষের এই ভাষার উপর দখল থাকলেও অধিকাংশই মানুষই কিন্তু পড়ে এর মর্মার্থ বুঝতে পারে না। অথবা বোঝার জন্য যেটুকু প্রচেষ্টা থাকা দরকার সেটুকুও আমরা করছি না। ফলে আমরা সেটা পড়ছি অনুধাবন করতে পারছি না। কোনো কিছু পড়ে অর্থ বুঝতে পারলে বুঝতে পারলে ভাষা মনের সাথে একটা যোগসূত্র তৈরি করে। তাই ভাষা জ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের মনের কুরআনের এই অন্তর্নিহিত ভাবটি আর জেগে উঠে না। ফলে জ্ঞানের একটা শূন্যতা থেকে যায়। তবে এটাই কুরআনের একটা বিশেষ বেশিষ্ট্য, মানুষ কুরআন বুঝে পড়ুক আর না-বুঝে পড়ুক এর প্রতি আকর্ষণ কিছুতেই কমতে চায় না। যতই পড়ে ততই পড়তে মন চায়। এর ভাষিক বৈশিষ্ট্য ও পারস্পরিক মিল বন্ধনের কারণে মানুষ মুগ্ধ হয়ে কুরআন পড়ে। তাই কুরআন যখন পড়বো এর আদব রক্ষা করে অবশ্যই থেমে থেমে সুন্দর করে পড়বো। কুরআন যখন পড়বো তখন যেন এই কথা অবশ্যই মনে করি আমি আমার মাওলার সাথে কথা বলছি। আর যখন সেজদার আয়াত তেলাওয়াত করবো চোখে যেনো পানি এসে যায়। আর যদি তা-ও না হয় তাহলে মনে যেন কান্নার ভাব থাকে। এইটুকু মহব্বত অবশ্যই অন্তরে রাখতে হবে। তাহলে এই কুরআন আমাদের জন্য নাজাতের অছিলা হবে।
কুরআন জ্ঞানীদের জন্য চিন্তার এক অবারিত দ্বার খুলে দিয়েছে। মানুষ যতই কুরআনের কাছে যাবে, কুরআনকে ভালোবাসবে তার জীবনটা সুন্দর থেকে সুন্দরতর হবে। কুরআনকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। এ কারণে অবশ্যই বুঝতে হবে কুরআন। জেনে নিতে হবে, কী আছে এই কুরআনে। ইচ্ছা থাকলে কুরআন বোঝা খুব সহজ বিষয়। আল্লাহ পাক তো নিজেই বলেছেন, আমি কুরআনকে বোঝা মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছি। এখন তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের হাতে মুঠোয়। অনুবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষার জ্ঞানকে আমরা কত সহজে আয়ত্ত করে নিচ্ছি। আর কুরআন তো একটি ব্যতিক্রমী বিষয়। পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষাতেই যাঁর অনুবাদ হয়েছে। বাংলাভাষায় যাঁর শত শত অনুবাদকের অনুবাদ রয়েছে। রয়েছে তাফসীর।
কুরআনের বিরুদ্ধে একশ্রেণির দুশমন এখনো রয়েছে। থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। ইসলামের প্রথম দিকেও কাফিররা মানুষ যাতে কুরআন অনুযায়ী চলতে না পারে সেজন্য কুরআন শ্রবণ থেকে মানুষদের বিরত রাখার চেষ্টা করতো। সূরা হা-মীম আস সাজদা’তে আল্লাহ তায়ালা সে কথাটিই চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন,‘আর কাফিররা বলে, তোমরা কখনো এ কুরআন শুনবে না এবং এর আবৃত্তি কালে শোরগোল সৃষ্টি করো, হয়তো তোমরা জয়ী হতে পারবে।’ কাফিরদের শত চক্রান্ত সত্ত্বেও তারা মক্কার সাধারণ মানুষকে কুরআনের তেলাওয়াত শোনা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। একদা হযরত ওমর ফারুক (রা.) কাবাঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। নবি করিম (সা.) তখন নামাজের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর কণ্ঠের সুন্দর তেলাওয়াত শুনে ওমর ফারুক (রা.) মনে মনে ভাবছেন মুহাম্মদ কি কবি হয়ে গিয়েছেন? এ সময় রাসূল (সা.) তেলাওয়াত করলেন, ‘আর এটি কোনো কবির কাব্যকথা নয়, অবশ্য তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো।’ (সূরা হাক্কাহ, ৬৯ : ৪১)
হযরত ওমর ফারুক (রা.) কুরআনের এ আয়াতটি শুনে এবার মনে মনে ভাবলেন, মুহাম্মদ (সা.) কীভাবে আমার মনের কথা জানলেন, তাহলে তিনি কি গণক? এবার রাসূল (সা.) তেলাওয়াত করলেন,‘আর এটা কোনো গণক কিংবা জ্যোতিষীর কথাও নয়, অবশ্য তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সূরা হাক্কাহ, ৬৯ : ৪২)
মহানবি (সা.) এর এ আয়াত তেলাওয়াত শোনার হযরত ওমর ফরুক (রা.) হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, এটা কবির কথা নাই, গণকের কথা নাই, তাহলে যেটা পড়ছে এটা কি? এমন সময় রাসূল (সা.) তেলাওয়াত করলেন,‘এটি জগতসমূহের মালিকের পক্ষ থেকে নাজিল করা হয়েছে।’ (সূরা হাক্কাহ, ৬৯ : ৪৩)
কুরআনের শিক্ষায় নিজেকে আলোকিত করতে হলে অবশ্যই কুরআনকে বুঝতে হবে। কাজে লাগাতে হবে কুরআন থেকে অর্জিত জ্ঞান। এর ফলে মানুষ যেমন মন্দ কাজ থেকে ফিরে থাকতে পারবে তেমনি ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। কুরআনকে বুঝতে পেরেছেন বলেই যে ওমর মূর্খতার কারণে একদিন খোলা তরবারি হাতে মহানবি (সা.) কে হত্যা করতে এসেছিলেন সেই ওমর (রা.) একসময় পরিণত হয়ে গেলেন ইসলামের একজন একনিষ্ঠ খাদেম হিসেবে। যাঁর সম্পর্কে মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘আমার পরে আর কোনো নবি আসবে না। যদি কোনো নবি আসত তাহলে সে হতো ওমর।’ ইসলামের সাহচর্চ ও কুরআনের শিক্ষাই মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। পরিণত করতে পারে যুগশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে।

লেখক : সাহিত্যিক গবেষক

 

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪৩,৭৬২,৮৮০
সুস্থ
৩২,১৫৬,৯৬৫
মৃত্যু
১,১৬৪,১৯১

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233