সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

সময়ের কাছে কেন আমি বেমানান

নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়ঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ১২৮ জন দেখেছেন

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান

মানুষকে ছোট করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করায় আমি কখনো অভ্যস্ত ছিলাম না। তবে মানুষের সুন্দর চেহারায় যখন মনের ভিতকার বিশ্রী দুর্গন্ধ উগরে উঠত তখন দারুণ খারাপ লাগত আমার। একজন জ্ঞানদীপ্ত মানুষ হিসেবে এ বিষয়টিকে আমি সহজে মেনে নিতে পারতাম না। সে যত কাছেরই হোক না কেন। অথবা পাশের।
একটি মুক্ত মানসিকতায় বেড়ে উঠেছি। মানুষকে সমীহ করা আমার সহজাত ধর্ম। আজও চোখের সামনে ভেসে উঠে বাবার দেখানো পথ। আমাকে বলা সব কথা। অনেক সময় আমি নীরব হয়ে ভাবি, বাবার দেয়া শিক্ষার কদর আজো কি সমাজে আছে? যুগের সঙ্গে সংগতিহীনে ভেবে তা কি প্রত্যাখিত হবে না?
বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকুরে। তাই তার কাছে দায়িত্বের কথাটাই বেশি শুনতাম। মাঝেমধ্যে অধৈর্য হয়ে যেতাম। ভাবতাম, বাবা কি কাজ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। কই, অন্যরা তো এসব নিয়ে ভাবে না। মা-ও বাবার সাথে মানিয়ে নিয়েছে। তার সব কাজকে মা সমর্থন দিয়ে যেতেন। আমি বলতাম, মা, তুমি কীভাবে বাবার একজন সহযোদ্ধা হয়ে গেলে। মুচকি হেসে মা আমাকে বলতেন-শোন বাবা, ‘ভালো মানুষকে সঙ্গ দেয়াও ভালো কাজ। তাছাড়া যে পয়সায় মুখে রুজি আসে, সন্তানের মুখে হাসি ফুটায়, তাকে তো হালাল করে নিতে হয়। মানুষের দায়িত্বও কখনো ইবাদতে পরিণত হয়। যদি তা সঠিক পন্থায় নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালিত হয়।’ আর আমি তো সেই মানুষটিকে উৎসাহ যোগায়, যে তাঁর কর্মে সৎ। নীতিতে অটুট।
বাবার সেই কথাটি এখনো আমার মনে আছে,‘পদ ও পদবী মানুষের বিচারের মানদ- নয়, বরং তার জীবনাদর্শ, তার মানবিক মূল্যবোধ তাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। স্বার্থের জন্য মানুষের সম্মান পাওয়া আর মনের টানে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এ দুয়ে অনেক তফাৎ। যারা মানুষ কেবল তারাই বোঝে আসলে কত গভীরে এর মানে।’
চাকরি জীবনে অতিবাহিত করেছি প্রায় ত্রিশটি বছর। ঘুরেছি দেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। মিশেছি অসংখ্য মানুষের সাথে। কাজের খাতিরে দেখেছি বহু মানুষকে। দেখেছি তাদের আচরণ। তাদের কাজ। কখনো হতবিহ্বল হয়েছি। প্রতিবাদ করতে যেয়েও পারিনি। কারণ আমার প্রতিবাদ মূর্খতায় পর্যবসিত হওয়া ছাড়া আর কোনো ফল বয়ে আনবে না। তাই নিজের পেশায় অটুট থেকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছি। আর মনে মনে সংকল্প করেছি আর সময় নষ্ট নয়, আমার জায়গা থেকে আমি ঘুরে দাঁড়াবো। তৈরি করবো কিছু প্রতিবাদী মানুষ।
আমি যা পারিনি ওরা তা পারবে। আমি পারিনি, কারণ আমি সহায়-সম্বলহীন একজন মানুষ। পদে পদে ভয় আছে অনেক। আমার দুটো ছেলে। দুটো মেয়ে। চাকরিটা চলে গেলে কী নিয়ে বাঁচব। কীভাবে ওদের মুখে দু’মুখো অন্ন তুলে দেব। তাই কাপুরুষ না হয়েও কাপুরুষের অভিনয়ে ছিলাম সারাটা জীবন।
জীবনের পরন্ত বেলায় এসে কিছুটা থমকে গিয়েছি। ছেলেমেয়েদের অনেক প্রশ্ন আমাকে ঘিরে। তবে ওরা আমাকে অসম্মান করে না। আর না তারা আমার আদর্শকে কোনোভাবে খাটো করে দেখে। আমার অহঙ্কার হয় ওদের নিয়ে। সমাজ আমাকে কতটুকু বুঝল তাতে আমার কিছু এসে যায় না। সান্ত¡না এই যে, আমার কাছের মানুষগুলো আমাকে বুঝতে পেরেছে। আমায় চিনতে পেরেছে। এ আমার অনেক বড় স্বীকৃতি।
সমাজকে আমি ঘুরাতে পারিনি, তবে আমি এমন কিছু মানুষ তৈরি করেছি, যারা আমার প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। আমার দেখানো পথে চলবে। এ প্রত্যয় আমার আছে। একদিন নিশ্চয়ই সমাজের দুষ্ট মানুষগুলোর সাথে চলতে-ফিরতে ওরা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নৈতিকতার শিক্ষায় ওদের আমি এভাবে মানুষ করতে পেরেছি। কখনো এরকম ভাবতাম, আমি আর কী করতে পারি? কতটুকু ক্ষমতা আমার? আমি তো একজন সাধারণ শিক্ষক। সমাজের কজন মানুষই-বা আমার কথা শোনে। কিন্তু না, এ ধারণা আমার ভুল ছিল। আমি অনেক কিছু করতে পারি। আমার হাতে গড়ে উঠে একঝাঁক তরুণ প্রজন্ম। যাদের মেধা ও মনশীলতায় আমাদের প্রভাবটাই সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কিন্তু আমরা দায়িত্ব নিহে চাই না বলেই, সমাজটাকে বদলাতে ওরা ভূমিকা রাখতে পারে না। যদি আমরা মেরদ- সোজা করে দাঁড়ায় তাহলে আমরা পাশে পাই হাজার পরিবর্তন প্রত্যাশী সংগ্রামী মানুষ।
জানি, আমি এককভাবে সমাজের অন্যায়কে রুখতে পারব না। সে শক্তি আমার নেই। তবে অন্যায়কে রোখার মতো কিছু মানুষ আমি তৈরি করার শক্তি আমি রাখি। এ বিশ^াস আমার আছে। কারণ আমি স্বার্থ নিয়ে ভাবি না। ভাবি আমার দেশ নিয়ে। দেশের মানুষ নিয়ে।
তাই আমার ছেলেমেয়েরা বলতে শুরু করেছে আমি শেষ বয়সে বদলে যেতে শুরু করেছি। এখন নাকি এসব বিষয় নিয়ে না ভাবাই ভালো। আমি ওদের জানাতে পারি না, আমি বদলাইনি। আর বদলালেও সেটা দোষের কিছু নয়। কারণ তারুণ্য কেবলই বয়সের সাথে ভাটা পড়ে না। কখনো কখনো ব্যতিক্রমী রূপ নিয়ে হাজির হয় মানুষের সামনে। ওদের বলতে ইচ্ছে হয়- দেখ তোরা, আমার ভিতরে ঘুমন্ত মানুষটা জেগে উঠেছে। যে নিজের ভিতর আর গুমরে গুমরে কাঁদতে চায় না।
আমি একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ডাবল শিফটের স্কুল এটি। আমার চাকরি জীবনে বড় কোনো সমস্যা ছাড়া এমন একটা দিনও কাটেনি, আমি দেরি করে বিদ্যালয়ে এসেছি কিংবা ক্লাস না করে বসে থেকেছি। আজ আমি এমন একটি বিদ্যালয়ে এসে পড়েছি যেখানে আমি অনিয়ম ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না। আর এই অনিয়মটাই এখানের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমাকেই মানিয়ে চলতে হবে তাদের সাথে। যে কিনা স্বপ্ন দেখে একঝাঁক প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টির, যারা অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
এই ছন্নছাড়া পরিবেশটাকে আমি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। যারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল তাদের স্বার্থে আঘাত লাগায় তারাই এখন আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তবে মন্দের মাঝেও ভালো লোকের সন্ধান পাওয়া যায়। আর এই মানুষগুলোই সমাজের ব্যতিক্রমী মানুষ। তেমনি কিছু মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যারা আমার সহকর্মী।
শেষ বয়সে এসে একরকম কষ্টে আছি আমি। তবে এই কষ্টের মাঝেও আশার আলো দেখি, যখন আমার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আমাকে পরম ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেয়। যদিও এই দুষ্টচক্রের কবর থেকে রক্ষায় ওরা আমার জন্য কিছুই করতে পারবে না। তবুও ওদের ভালোবাসায় আমার সঞ্জীবনী শক্তি ফিরে আসে।
দোষ আমার একটাই আমি একরোখা। নিজের সিদ্ধান্তকেই অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চাই। কী করার থাকে একজন মানুষের যখন তার চারপাশের মানুষগুলো নিজেদের ভুল জেনেও পরিবর্তন হতে চায় না। বরং অসহযোগিতার ডালপালা বিস্তার করে একজন ভালো মানুষকে অন্ধকারে ফেলে দিতে চায়। তখন সে না-পারে নীতি ভ্রষ্ট হতে আর না-পারে অসৎ মানুষের সাথে হাত মেলাতে। তখন তার কঠিন পথে হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
এমন একটা সমস্যার চক্র বাঁকে জড়িয়ে আমি এখন অস্থিরতায় ভুগছি। আমার পাশের চেয়ারের মানুষটি দেখতে সৎ। কথায় তার অন্তরের কদর্য প্রায়ই প্রকাশ পায়। তার কথার চেয়ে ভয়ংকর তার পেছন থেকে আঘাত করার অভ্যেসটা। কেন সে এসব করে তা আমি স্পষ্ট বুঝতে না-পারলেও একদিন ঠিকই জানতে পারলাম, ক্ষমতার লোভ তা বহুদিনের। এ পর্যন্ত বহু শিক্ষককে সে নানা ভাবে লাঞ্ছিত করেছে। এর পেছনে কারণ অনেক। আছে টিউশনি বাণিজ্য। সুসংগঠিক সিন্ডিকেট। যারা বিদ্যালয় থেকে ব্যক্তি স্বার্থে বহু সুযোগ হাতিয়ে নেই। এখন আমি তাদের জন্য অনেক বড় বাধা। আমি অন্যত্র চলে সেই লোভাতুর ব্যক্তিটি চেয়ারে বসতে পারে।
সাম্প্রদায়িকতার এক অভিযোগ এনে আমাকে দাঁড় করালো বিচারের কাঠগড়ায়। কিন্তু সে অভিযোগ আদৌ সত্য প্রমাণিত হয়নি। তবু আমাকে এমন মানসিক চাপে ফেলানো হলো, যেন আমি অপরাধ করেছি। শিক্ষকদের ভরা মজলিসে আমাকে এমন সব কথা বলা হলো যা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি একটি দিনও শিশুদের জীবনকে থেকে নষ্ট করতে চাই না। আমার সামনে দিয়ে কয়েকশত শিক্ষার্থীর একটি দিন অকারণে মাটি হয়ে যাবে একজন আদর্শবান বাবার সন্তান হয়ে আমি তা মেনে নিতে পারি না। কারণ-অকারণে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে তা আমি মানতে পারি না। এ শিক্ষা আমি পাইনি। আমার কর্ম আমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান। এখানে আমি কোনো কালিমার আঁচড় লাগতে দিতে পারি না। তাতে শেষ পরিণতি যাই হোক না কেন।
এই চাপ আমি সইতে পারলাম না। প্রেসার বেড়ে গেল। সুগারের অবস্থাও ভালো নয়। চেয়ে দেখি, আমি বিছানায়। মাত্র যার ঘুম ভেঙ্গেছে। তাহলে এর আগে যা হয়েছে সবই সত্য। জাগরণের উল্লাস ভেসে আসছে আমার চারপাশে। মানুষর মুখরিত শব্দে আমি আমার বাবার কথা মনে করি।

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৩৩,২৯০,৩৮৩
সুস্থ
২৪,৬০৮,২৩৬
মৃত্যু
১,০০১,৯৬৭

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233