শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

ধারাবাহিক উপন্যাস-সায়মন

আশিক মিজান
  • প্রকাশের সময়ঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ১৫২ জন দেখেছেন

পর্ব-০১

সায়মন চুপচাপ সোফার উপর বসে আছে। সামনে টিভি চলছে। মাঝেমধ্যে দু-একবার চোখ তুলে টিভির দিকে তাকায়। আবার অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। রঙিন পর্দায় আজ তার চোখ বসছে না। অথচ যে ছেলেটিদুদিন আগেও অপলক চেয়ে থাকত। সায়মন এমনিতেই ফূর্তিবাজ। হাসি-খুশি চেহারা। তার দুরন্তপনায় প্রত্যেকে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। তবুও দারুণ লাগে। তার এমন আচরণ কিছুতেই তার সাথে মেলাতে পারে না আফি। সায়মনের এমন ভিন্ন রূপ আগে কখনো কারো চোখে পড়েনি।
আফি বলল ঃ দাদা, তুই এরকম করছিস কেন ?
সায়মন চোখ তুলে একবারও আফির দিকে তাকাল না। এতে অবাক হয় আফি। সে সায়মনেরভিতর এক ভিন্ন মানুষ দেখতে পায়। আফি মনে মনে ভাবে, এমন কী ঘটেছে, যা ও আমাদের থেকে লুকাচ্ছে।
আফি আবার বলল-দাদা, তুই আমার কথা শুনছিস ?
কেন শুনবো না। তুই বোলে যা।
তখনো মুখটা অন্যদিকে ফিরানো। আফি কারো ব্যক্তিত্বে আঘাত দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না। ছোটবেলা থেকেই এমন শিক্ষায় বেড়ে উঠেছে তারা। কারো পারসোনাল বিষয়ে ইনটারফেয়ার করার মতো মানসিকতা তার নেই। হতে পারে সায়মন তার ভাই। তাতে কী এসে যায়। তাই সে আপাতত সায়মনের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যায়। মাথা থেকে এ চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও কেন জানি নিত্যনতুন ভাবনার উদয় হয়। অজানা আশংকা এসে ভিড় জমায়। চারপাশের কথা ভেবে এমনিতেই ভালো লাগছে না তার।
সায়মনঅত্যন্ত ভোজনরসিক। মাছ-মাংস হলে তো কথাই নেই। এসব খেতে দারুণ পছন্দ করে। আফিও ভাইয়ের জন্য টেবিলে নানারকমের খাবার সাজিয়ে রাখে। দুদিন ধরে লক্ষ করছে, সায়মনের খাবার-দাবারে তেমন একটা আগ্রহ নেই। আধপেট খেয়েই তাড়াতাড়ি উঠে যায়। সবসময় কেমন একটা তাড়াহুড়ো। মনে হচ্ছে কিছু একটা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
সায়মনকে আফি এ নিয়ে জিজ্ঞাসাও করেছে।সায়মন কোনো উত্তর দেয় না। শুধু এইটুকু বলে নীরব হয়ে যায়, তুই কীসব বলছিস আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ?
আফি আর কথা বাড়ায় না। কেবল এটুকু জানতে চায়, তাহলে এতরাত করে ফিরছিস কেন ?
আফি, তুই পারিসও বটে। দেখতেই পারছিস, বাড়িতেই থাকি। মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটালে মনটাও ভালো থাকে। তাছাড়া দিনটাতো শুয়ে-বসেই কেটে যায়। বাড়িতে সারাদিন বাবার ওই একই কথা শুনতে আর ভালোলাগে না।
তুই তো এমন ছিলি না। কী হলো তোর ?সময়টা চাইলে একটা ভালো কাজেও ব্যয় করতে পারিস।
মানুষের সবসময় একভাবে কাটে না বোন। মনের কথাও কখনো কখনো শুনতে হয়। যদি নিজের কথা শুনতাম, আজ আমার এ পরিণতি হতো না।
দেখ, বাবা রাগের বশে দুটো কথা বলছে। তাই বলে বাবার উপর রাগ করে থাকবি। বাবা রিটার্ড পারসোন। তার মন-মেজাজ এমনিতেই ভালো নেই। তাছাড়া তুই সংসারের বড় ছেলে। এখনো তোর একটা চাকরি হলো না। পেনশনে যে কটা টাকা পায় এ দিয়ে টেনেটুনে কোনোমতে সংসারটা চলে। কোথায় বাপের কষ্ট বুঝবি উল্টো তার উপর রাগ করিস। তুই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। যে কিনা সংসারে দুটো পয়সা আয়রোজগার করে বৃদ্ধ বাবা-মার মুখে হাসি ফুটাবি। অথচ তাদের ঘাড়ে বোঝা হয়ে চেপে আছিস। এ কী কম দুঃখের।
বিয়ে করলি, অল্প বয়সে বউটাও চলে গেল। তার কোনো খবর পর্যন্ত রাখিস না। লোকমুখে বাবা কত কথা শোনে। তবুও কিছু বলতে পারে না। নাতির জন্য মনটা কাঁদে। একবার যেতে পারে না, কোন মুখে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে।
ঘরে একটা বড় বোন। তার বিয়ে দিলি, সে-ও স্বামীর ঘর করতে পারল না। স্বামী চলে গেল তাকে ফেলে। ছোট বোনও বিয়ের উপযুক্ত। এরকম একজন বাবার থেকে কী ব্যবহার আশা করা যায় ? তোকে তো বাবা কম লেখাপড়া শেখায় নি। নিজে একটা কেরানির চাকরি করেছে। তবুও তোকে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়িয়েছে।
ছাত্রজীবনে কেবল প্রেমই করেছিস। ক্যারিয়ার নিয়ে কখনো ভাবিসনি। প্রেম করলে নাকি মানুষ বদলে যায়। তোর হোলো না কিছুই। মেয়েদের পিছে কেবল টাকাই উড়ালি। আর বসে বসে বেহুদা সময় কাটালি। না হতে পারলি ভালো প্রেমিক। না ভালো স্বামী। তোকে ছেড়ে ভাবি বড় বাঁচাটাই-না বেঁচেছে। আফিকে কিছু বলতে যেয়েও সায়মন বলল না। এসব কথা শুনে বাইরে চলে গেল।
রাফি ড্রইংরুমে বসে বই পড়ছে। হঠাৎ দরজা নক করার আওয়াজ শুনতে পায়। রাফি দরজা খুলে দেয়। দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে লম্বা চওড়া শ্যামবর্ণের দাড়িওয়ালা মধ্যবয়সের এক লোক। হাতে একটি চিঠি।
রাফিকে জিজ্ঞেস করে তালুকদার সাহেব কি বাসায় আছেন ?
রাফি উত্তর দেয়, হ্যাঁ।
আপনি তার মেয়ে ?
জি। ছোট মেয়ে।
তাহলে সায়মন আপনার ভাই।
রায়ের বাজার থেকে একখানা চিঠি এসেছে। তালুকদার সাহেবের কাছে পাঠিয়েছেন আয়নুদ্দিন মাতুব্বর। আপনি তাকে ডাকুন। রাফি বাবাকে ডাক দিল। বাবা, তোমার নামে কোন এক আয়নুদ্দিন চিঠি পাঠিয়েছে। আবিদ হোসেন মেয়ের কণ্ঠে আয়নুদ্দিন নামটি শুনে অবাক হলেন। এতদিন পর তিনি আমাকে চিঠি লিখলেন। নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে, যার কারণে স্মরণ করতে বাধ্য হয়েছেন।
মেয়ের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালেন আবিদ। মেয়েকে কিছু বললেন না। কিছু বুঝতেও দিলেন না। তিনি আফিকে বললেন, তোর মাকে বল বাবা ডাকছে। সুমার আসতে দেরী হওয়ায় তিনি নিজেই ডাক দিতেন-সুমা, এইদিকে এসো। স্ত্রী এসে পাশে বসল। দুজনে বেশ কয়েকবার চিঠিটার দিকে তাকালেন। এবার সুমা বলল ঃ এভাবে তাকিয়ে কী দেখছ ? খোল। খামটা ছিড়ল আবিদ। চিঠির গোটা গোটা অক্ষরগুলো জ¦ল জ¦ল করছে।

রায়ের বাজার, ঢাকা
তাং ৩০/১১/১৯
বেয়াই,
কখনো ভাবিনি আজকের এ দিনটি দেখতে হবে। কতদিন হয়ে গেল মেয়েটা এসেছে। একবারও কি ওদের কথা মনে পড়ল না ? একটি বারের জন্যও কেউ জানতে চাইলেন না ওরা কেমন আছে ?মরে গেছে নাকি বেঁচে আছে ? কী অপরাধ করেছে আপনার ছোট্ট দাদুভাই ?ভালোবাসার জোরে সম্পর্ক টিকে থাকে। যে সম্পর্কের মাঝে কোনো ভালোবাসা নেই তাকে বাঁচিয়ে রেখে কী লাভ ? তার চেয়ে বরং এ সম্পর্কটা নাইবা রাখলেন।
আমি একজন বাবা। চোখের সামনে এভাবে মেয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিতে পারি না। মেয়েকে পাঁচজনে পাঁচ কথা বলে। তীরের মতো বুকে এসে লাগে। ভীষণ কষ্ট হয়। আমি মেয়ের বাবা তাই আমাকে সব মেনে নিতে হয়। কীভাবে মানুষের মুখ বন্ধ রাখব ?সমাজে বাস করি। আত্মসম্মানের কথা ভাবতে হয়। এতদিন হলো আপনার ছেলে আমার মেয়ের একটা খবর পর্যন্ত নিল না। নিজের ছেলেকে দেখতেও এলো না। কথাগুলো বলতে দারুণ কষ্ট হচ্ছে, তবুও না বলে পারি না।

                                                                                                                                                ইতি
আপনার বেয়াই
আয়নুদ্দিন (মাতুব্বর)

সায়মন দুদিন ধরে বাড়িতে ফিরছে না। কোথায় সে এ খবরও কারো জানা নেই। সুমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে ছেলেকে নিয়ে। রাগের সুরে বিড়বিড়িয়ে বলছে, বাড়িতে থাকলে যত গালমন্দ শুনতে হয়। বাবা আর মেয়ে দুজন মিলে ছেলেটাকে দুদ- সুস্থ থাকতে দেয় না। মা ছেলের জন্য অস্থির। তিন দিন হতে চলল সায়মন বাড়ির বাইরে। কোথায় আছে, কেমন আছে, কে জানে।
মা গোপনে ছেলের খোঁজ করে। সন্ধান মেলাতে পারে না। সুমা ভাবে, ওর কি মায়ের কথা একবার মনে পড়ে না ? আয় বাবা! ফিরে আয়। সুমার ধারণা, সায়মন হয়তো শ^শুরবাড়ি গিয়ে থাকবে। আবার ভাবে, না। তবুও সে বেয়াইকে ফোন দিয়ে সায়মনের ব্যাপারে খোঁজ নেয়। আয়নুদ্দিন অবাক হয় তার কথায়। মায়ের আঁচল ধরা ছেলেটা তাকে না-বলে কোথাও বের হবে এটা সে ভাবতেও পারে না।
রাত বারোটার দিকে পাশের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। পরদিন সকালে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে জুহানের ছেলে রকিব কোনো এক ভয়ানক অপরাধের সাথে জড়িত। পুলিশ তাকে খুঁজছে। এর চেয়ে বেশি কিছু আর কেউ জানে না। সুমার চিন্তাটা আরও বেড়ে যায়। আবিদের সাথে রাগারাগি করে। এশার নামাজ পড়ে নীরবে জায়নামাজেই বসে থাকে। আবিদ এসে অনেক ডাকাডাকি করলেও সে স্বামীর কথা শোনে না। আবিদের উপর রেগে যায়। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও আবিদ তাকে কিছু খাওয়াতে পারেনি।
আবিদও শুয়ে পড়ে। মেয়েরা অনেক ডাকাডাকি করলেও সে উঠেনি। মনে মনে আফিও কষ্ট পায়। যে ব্যবহার আমরা ভাইয়ের সাথে করেছি, উচিত হয়নি। হতে পারে ভাইটা বেকার তাই বলে। ছি! ছি!। একদম ঠিক করিনি।
চাকরির বাইরেও স্বাধীনভাবে কত পেশা বেছে নেয়া যায়। মেধা খাটিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে মানুষ জীবনে কত কী করে। সায়মনও নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করবে। চাকরির হাতে গোনা ক’টা টাকা দিয়ে কী আর করা যায়। আর আমরা বোন হয়ে ভাইয়ের সর্বনাশ করছি। যা করেছি অন্যায়। আমাদের এ তুচ্ছতাচ্ছিল্য ওর অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বহুদিন হলো সায়মন ঘর ছেড়েছে। আর ফিরে আসেনি। সায়মনকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। একদিন তাকে নিয়ে সব ভাবনার অবসান হলো। তারই লেখা একখানা চিঠি এলো বাড়িতে। সায়মন লিখেছে সে আর বাড়ি ফিরবে না। অভাব আর দারিদ্র্যতা তাকে বুঝিয়েছে জীবন কী। টাকার কাছে মানুষের ভালোবাসা কত অসহায়। এ পৃথিবীতে দাম আছে কেবল তাদের, যাদের প্রচুর টাকা আছে। টাকাহীন ভালোবাসার মূল্য আজকাল কম মানুষই বোঝে। তাই যেদিন সবার কাছে আপন হবার মতো নিজের কোনো পরিচয় তৈরি হবে সেদিন তোমাদের সায়মন তোমাদের কাছে ফিরে আসবে। আর এই দিনটি যদি কখনো না আসে ধরে নিও তোমাদের সায়মন নেই। সে কোনোদিনও ফিরে আসবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

আরও সংবাদ পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪২,৪৬০,৫৩৯
সুস্থ
৩১,৪১৩,৬০৮
মৃত্যু
১,১৪৮,৬৮৮

বাংলাদেশে কোরোনা

মোট

১৭৮,৪৪৩

জন
নতুন

২,৯৪৯

জন
মৃত

২,২৭৫

জন
সুস্থ

৮৬,৪০৬

জন
© All rights reserved © 2019 ongkur24.com
Design & Developed By: NCB IT
112233